জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাড়ছে বিদ্যুতের দামও। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মাথায় দ্বিতীয় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। গত ৩১ মে ঘোষিত নতুন দরে ডিজেলের মূল্য অপরিবর্তিত থাকলেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি জুন মাসে বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের দাম কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো সংবেদনশীল পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুতই অর্থনীতি ও জনজীবনে পড়ে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে মধ্য ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলো বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়বে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে কৃষি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায়। একই সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানা, সেচব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ ও উৎপাদন খাতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার দুই দফায় বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের মূল্য সমন্বয় করেছে। সর্বশেষ ঘোষিত নতুন মূল্য ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গত ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে কমানো প্রয়োজন। তারা মনে করেন, মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন খাতকে আরও চাপে ফেলবে।
মূল্য বৃদ্ধিতে যে প্রভাব পড়বে: জ্বলানি ও বিদ্যুৎ সংবেদনশীল পণ্য হওয়ার কারণে আর সর্বগ্রাসী প্রভাব জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করবে। বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে টান পড়বে। কারণ বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত অন্যান্য সেবামূলক জিনিসের দামও এর ফলে বেড়ে যায়। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বাড়লে তা সরাসরি কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে যুক্ত হয়। ফলে চাল, ডাল, তেলসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। কারখানাগুলোতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যোবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয় এবং রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়তে পারে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প যেমনÑ ছোট কারখানা, দোকান, এবং কুটির শিল্পগুলোর জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য করে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। যার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে জীবনধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ঘাটতির অজুহাতে বারবার দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তার মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৪০ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রয়েছে, যা কমানো গেলে ভর্তুকির চাপও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তিনি আরও বলেন, অতীতে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে যে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার বোঝা এখন সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, গত মাসে এক দফা মূল্যবৃদ্ধির পর আবারও জ্বালানির দাম বাড়ানো জনজীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি করবে। তার দাবি, এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, কেবল গত মাসেই জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অথচ এই কঠিন সময়ে মানুষের আয় বাড়েনি, বরং ক্রমাগত বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট প্রকট হচ্ছে। দিশেহারা জনগণ যখন দু'বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আবারও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করায় জনগণের ওপর ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে এলে দেশের বাজারেও দ্রুত মূল্য সমন্বয় করে সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি জানান, বিশ্ববাজারের বাস্তবতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে সরকার অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানির দাম বাড়াতে চায় না এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে জনগণের স্বার্থে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার কখনোই অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে চায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প ছিল না।