জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, কর কর্তৃপক্ষ বর্তমানের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপ রয়েছে। এই অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে সাধারণ ও সীমিত আয়ের ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নতুন করে কোনো উৎসে কর না বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, কর কর্তৃপক্ষ বর্তমানের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল। তবে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রস্তাব সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন পায়নি। সাধারণ মানুষের ওপর নতুন কোনো আর্থিক বোঝা না চাপানোর উদ্দেশ্যে সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। মূলত বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা ও ভোক্তাদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে কর বাড়ানো হলে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। রাজস্ব কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কর বৃদ্ধির যেকোনো সিদ্ধান্ত বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে। অনেক সময় ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীরা নিজেদের মুনাফার অঙ্ক ঠিক রাখতে কিংবা বাড়াতে কর বৃদ্ধির অজুহাত সামনে আনেন। কর যতটুকু বাড়ে, বাজারে পণ্যের দাম তার চেয়েও বাড়ানো হয় বেশি। বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য সংগ্রহ ও আমদানিÑ উভয় ক্ষেত্রেই করছাড়ের সুবিধা বহাল রয়েছে। চিনি, সয়াবিন তেল, ধান, চাল, গম, আলু ও পেঁয়াজের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর এখন শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য রয়েছে, যা আগামী বাজেটেও অপরিবর্তিত থাকবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারের বিশেষ চেষ্টা ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত বাজেটে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। প্রান্তিক কৃষক ও স্থানীয় বাজার সরবরাহকারীদের ওপর থেকে আর্থিক বোঝা কমানোর লক্ষ্যেই এই কল্যাণমুখী উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর ফলে ধান, চাল, গম, আলু, পাট ও চা-পাতার সরবরাহ থেকে অর্জিত আয়ের ওপর উৎসে কর কমানো হয়। এই কর মূলত পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) এবং স্থানীয় বাজার থেকে বড় পরিসরে পণ্য সংগ্রহের ওপর ধার্য করা হয়ে থাকে। সরকারের বিদায়ী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আমদানি পর্যায়ের উৎসে কর সামগ্রিক রাজস্ব সংগ্রহ বা পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে খুব বড় প্রভাব ফেলে না। তা সত্ত্বেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এটিকে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর প্রধান অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। সেই অসাধু প্রবণতা বিবেচনায় নিয়েই স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর অর্ধেক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে কর কমানোর এই নীতিগত সুবিধার পরও দেশের বাজারে এর কোনো আশানুরূপ ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। সাধারণ ভোক্তারা এই করছাড়ের সুফল পুরোপুরি পাননি। উল্টো আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে দেশের বাজারে জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে টানা ৫১ মাস ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আসন্ন বাজেটে নতুন করে কর বাড়ানো হলে বাজার পরিস্থিতি আরও অনিয়ন্ত্রিত ও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা ছিল। করের আওতাভুক্ত এই সংবেদনশীল পণ্যগুলোর তালিকায় রয়েছেÑ ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, চিনি, ভোজ্য তেল, গোলমরিচ, দারুচিনি, বাদাম, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতার মতো খাদ্যদ্রব্যসহ সব ধরনের ফলমূল এবং কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ।
আসন্ন বাজেটে কর বৃদ্ধির প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ায় বাজারে নতুন করে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতায় কিছুটা লাগাম টানা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, কেবল করছাড় দেওয়াই বাজার স্থিতিশীল করার জন্য যথেষ্ট নয়। বিগত দিনগুলোতে কর কমানোর পরও বাজারে দাম না কমার অভিজ্ঞতা থেকে এটি স্পষ্ট, সরকারের দেওয়া সুবিধার বড় অংশই মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যায়। তাই করছাড়ের সুফল যেন সরাসরি সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায়, তার জন্য একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
দেশের সর্বশেষ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। এর আগের মাস অর্থাৎ মার্চে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পর মার্চে সামান্য কমলেও এপ্রিলে তা পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর অর্থ হলো, গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই মূল্যস্ফীতির ওপর। গত ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। জ্বালানি তেলের এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুসারে, গত এপ্রিল মাসে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গ্রাম কিংবা শহরÑ এখন সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ আরেক দফা বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি যখন একটানা উচ্চ থাকে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। যদি মানুষের আয় বা মজুরি মূল্যস্ফীতির হারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ে, তবে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। গত এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যে হারে বেড়েছে, মানুষের মজুরি বা আয় বেড়েছে তার চেয়ে কম।
মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি হওয়ার অর্থ হলো সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। এর ফলে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য বা পণ্য কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে অথবা বাধ্য হয়ে দৈনিক খাদ্যতালিকা, চিকিৎসাব্যয়, সন্তানদের যাতায়াত ও কাপড়ের খরচে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।