× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংবাদ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ বেতারের ড্রেস কোড বিতর্ক: দায় কার?

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ২৩:১৪ পিএম

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ২৩:৪৯ পিএম

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ বেতার সম্প্রতি সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য জারি করা ড্রেস কোড বা পোশাকবিধি হঠাৎ করেই বাতিল করেছে। প্রথমে এটি সাধারণ প্রশাসনিক নির্দেশনা মনে হলেও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা ও বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে তা দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রীয় একটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানে এমন সংবেদনশীল নির্দেশনা জারির আগে যথাযথ নীতিগত যাচাই-বাছাই কি হয়েছিল? আর যদি হয়েই থাকে, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তা বাতিলের প্রয়োজন পড়ল কেন? রবিবার বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এ এস এম জাহীদের সই করা নতুন এক অফিস আদেশে জানানো হয়, ৪ মে জারি করা ড্রেস কোডসংক্রান্ত আগের নির্দেশনাটি আর কার্যকর থাকবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে বিতর্কের অবসান ঘটলেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রাথমিক নির্দেশনায় সংবাদ উপস্থাপকদের পোশাক, সাজসজ্জা ও উপস্থাপনার ধরন নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড আরোপ করা হয়েছিল। বিশেষ করে ‘ওড়না এভাবে নয়’ কিংবা ‘টিপ বড় পরা যাবে না’ ধরনের নির্দেশনা সামাজিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকের মতে, এগুলো পেশাগত শৃঙ্খলার সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পছন্দের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল। বাংলাদেশ বেতারের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন নির্দেশনা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, নারী ও পেশাগত স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, জনমত ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া এখনও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ বেতারে দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থাপনা, ভাষা ও আচরণে নির্দিষ্ট মান বজায় রাখার সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্দেশনাটি অনেকের কাছেই সেই সীমা অতিক্রম করেছে বলে মনে হয়েছে। কারণ, এটি শুধু শালীনতা বা পেশাগত মানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নির্দিষ্ট একধরনের সৌন্দর্যবোধ ও সামাজিক রুচি চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মেয়াদ মাত্র তিন মাস হতে চলেছে। এখানেই মূল প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—রাষ্ট্রীয় একটি গণমাধ্যমে কর্মীদের ব্যক্তিগত পোশাক ও সাজসজ্জা নিয়ে এতটা সূক্ষ্ম নির্দেশনা নীতিগতভাবে আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না। নাকি এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পর্যাপ্ত সামাজিক ও পেশাগত পর্যালোচনার অভাবেরই ফল? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দেশনার পেছনে নতুন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কোনো নীতিগত অনুমোদন ছিল কি না।

সাধারণত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে যায় এবং তা মন্ত্রণালয়ের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। যদি উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন ছাড়াই এমন নির্দেশনা জারি হয়ে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক সমন্বয়ের দুর্বলতা নির্দেশ করে। আর যদি অনুমোদন নিয়েই নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে তা প্রত্যাহার নীতিগত স্থিরতা ও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কর্মরত উপস্থাপকেরা কি শুধুই ‘প্রেজেন্টার’, নাকি তাঁরা পেশাদার সাংবাদিক ও সৃজনশীল কর্মী? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তাদের ব্যক্তিগত উপস্থাপনাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, সেই সীমারেখা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক গণমাধ্যমে সাধারণত জোর দেওয়া হয় পেশাগত আচরণ, ভাষা ও দক্ষতার ওপর; ব্যক্তিগত পোশাকের খুঁটিনাটি নিয়ন্ত্রণের ওপর নয়।

পোশাকবিধি জারি করে আবার দ্রুত তা প্রত্যাহার করার ঘটনাটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্থিরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন দ্বিধাগ্রস্ত নীতি শুধু অভ্যন্তরীণ বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, বরং প্রতিষ্ঠানের পেশাদার ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি এমন বার্তাই দেয় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে যথেষ্ট গবেষণা, পরামর্শ ও অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমের চাপের মুখে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—নীতিনির্ধারণ কি দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি তাৎক্ষণিক জনমতের চাপে পরিচালিত হচ্ছে?

সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পেশাদার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা; কোনো নির্দিষ্ট রুচি বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া নয়। পোশাক ব্যক্তিগত সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেখানে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় কর্মীদের আত্মসম্মান ও পেশাগত আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে এমন নির্দেশনা অনেক সময় ‘শৃঙ্খলা’র নামে শরীর ও পরিচয়ের ওপর অপ্রয়োজনীয় নজরদারি তৈরি করে।

তবে প্রশাসনের অন্য একটি যুক্তিও রয়েছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট উপস্থাপনাগত মান বজায় রাখা প্রয়োজন, কারণ এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেই ‘মান’ নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি অংশগ্রহণমূলক না হয়ে একতরফা হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ বেতারের নির্দেশনা বাতিল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে, সিদ্ধান্তটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এটি শুধু একটি নির্দেশনা প্রত্যাহার নয়; বরং এটি একটি উপলব্ধি—সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও বিস্তৃত আলোচনা, পেশাজীবীদের মতামত এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

এই ঘটনা আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—আমরা কি এখনও কর্মক্ষেত্রে নারীর দক্ষতার চেয়ে তার পোশাককে বেশি গুরুত্ব দিই? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে এমন নির্দেশনার প্রয়োজন কেন তৈরি হয়? আর যদি সমাজের অবচেতন মানসিকতা এর পেছনে কাজ করে, তাহলে তা চিহ্নিত ও সংশোধন করা জরুরি।

সামাজিক মাধ্যমে এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে, সমাজ এখন আর আগের মতো নীরব নয়। মানুষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শিখেছে, আর এই প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতিই গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি। একই সঙ্গে ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়—স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও সংবেদনশীলতা ছাড়া কোনো নীতিই দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা পায় না।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা