সিইটিপি সংকট পরিবেশ দূষণ ও আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে হুমকিতে পড়েছে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পরিকল্পিত শিল্পায়ন আর দূষণমুক্ত পরিবেশের আশায় হাজারীবাগ থেকে সাভারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল চামড়া শিল্প। তবে দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে উল্টো সাভারেও সেই পুরনো হাজারীবাগের চিত্রই ফিরে আসছে।
কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে সচল না হওয়ায় একদিকে যেমন ধলেশ্বরী নদী ও চারপাশের জলাশয় মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করতে না পেরে আন্তর্জাতিক বাজারেও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। দেশের এই সম্ভাবনাময় শিল্প এখন পরিবেশ রক্ষা, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রয়োজনীয় সনদ অর্জনÑ এই ত্রিমুখী সংকটে জর্জরিত।
সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়িক নেতারা অভিযোগ করেছেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ১৬২টি বরাদ্দপ্রাপ্ত ট্যানারির মধ্যে প্রায় ১৪০টি কার্যক্রম চালালেও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অভাবে তারা বিশ্ববাজারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। বিশেষ করে সিইটিপি অকার্যকর থাকায় বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশছে, যা পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ।
লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের (এলআইডিএফবি) পক্ষ থেকে জানানো হয়, সিইটিপি নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনও অপরিশোধিত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। এই সংকট নিরসনে তারা এখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। তাদের মতে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই খাতের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে তারা হয় একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় অথবা একটি শক্তিশালী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গভর্নিং বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যারা নীতিনির্ধারণ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি করবে।
চামড়া খাতের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল মূলত আমদানিনির্ভর হলেও চামড়া সম্পূর্ণ দেশি সম্পদ। জুতা বা অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য তৈরির মাধ্যমে এই খাতে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যালু অ্যাডিশন বা মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বার্ষিক রপ্তানি আয় ১২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে কেবল বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে কোনো লাভ হবে না। বরং কীভাবে এই লক্ষ্য অর্জন করা যাবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা দরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্র বাংলাদেশের জন্য আরও উদ্বেগজনক। গ্লোবাল মার্কেট রিসার্চ ফার্ম ‘ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস’-এর তথ্যমতে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রায় ৭৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অথচ বাংলাদেশ এই বিশাল সুযোগের সামান্য অংশও কাজে লাগাতে পারছে না। এর প্রধান কারণ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সার্টিফিকেশন বা সনদ না থাকা। ইউরোপ ও আমেরিকার প্রিমিয়াম বাজারে রপ্তানির জন্য এই সনদ বাধ্যতামূলক হলেও বাংলাদেশের মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠানের এই স্বীকৃতি রয়েছে। ফলে সরাসরি পশ্চিমা বাজারে পণ্য পাঠাতে না পেরে দেশের ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে কম দামে চীনে চামড়া বিক্রি করছেন। চীন সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে কয়েকগুণ বেশি দামে পুনরায় পশ্চিমা দেশগুলোতে রপ্তানি করছে, যার সুফল বাংলাদেশ থেকে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
দেশের চামড়া সরবরাহের মূল সময় হলো ঈদুল আজহা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর প্রায় ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে এবং বার্ষিক চামড়া সরবরাহের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই আসে এই ঈদ মৌসুমে। সঠিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এই অপচয় রোধে এলআইডিএফবি থেকে ১৩ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশজুড়ে ১০ থেকে ১৫টি সরকারি আধুনিক কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ হাব এবং কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক আব্দুল মোত্তালিব বলেন, বাংলাদেশ যদি বিশ্ববাজারের মাত্র ১ শতাংশও দখল করতে পারে, তবে এই খাতের রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অথচ সম্ভাবনার এই দুয়ার এখনও অবহেলায় রুদ্ধ।
চামড়া শিল্প রক্ষা করতে হলে শুধু কলকারখানা স্থানান্তর নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষা ও গুণগত মান নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার জায়গা তৈরি করা জরুরি।
এলআইডিএফবির আহ্বায়ক সাদাত হোসেন সেলিম বলেন, সাভারের সিইটিপি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বছরের পর বছর আলোচনা হলেও অগ্রগতি সামান্যই। এখন এ খাতের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।