আইলা আঘাতের ১৭ বছর
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ খুলনা
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ১৫:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ১৫:৪৮ পিএম
উপকূলের মানুষ আজও লড়ছেন মাটির নিচে জমে থাকা নীরব দুর্যোগের বিরুদ্ধে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
খুলনার কয়রা, বটিয়াঘাটা ও দাকোপসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে ঘরবাড়ি, পুকুর, খাল ও কৃষিজমিতে। প্রায় ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই লবণাক্ততার ক্ষত এখনও কাটেনি। উপকূলের কৃষকেরা আজও লড়ছেন মাটির নিচে জমে থাকা নীরব দুর্যোগের বিরুদ্ধে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, কৃষক-সাক্ষাৎকার, কৃষি বিভাগের তথ্য ও মৃত্তিকা গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে উপকূলীয় কৃষি ক্রমেই সংকটে পড়ছে। লবণাক্ততার পাশাপাশি বাড়ছে পানির সংকট, উৎপাদন ব্যয়, তাপদাহ ও অনিশ্চিত আবহাওয়া। ফলে একসময় ধান, পাট, ডাল, তিল ও সবজিতে ভরা অনেক জমি এখন অনাবাদি পড়ে আছে। কোথাও চাষ হলেও ফলন কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষকেরা জানান, আইলার আগে জমিতে প্রায় সব ধরনের ফসলই ভালো হতো। এখন গরম বাড়লেই মাটির ওপরে সাদা লবণের স্তর দেখা যায়।
কৃষক স্মৃতি রানী মণ্ডল বলেন, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, লাউ, টমেটো চাষ করছি। কিন্তু ফলন আগের মতো হয় না। পানি দিলেও গাছ বড় হতে চায় না। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কৃষক দীপক কুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, আগে যা ফেলতাম তাই ফলত। এখন বীজ ঠিকমতো গজায় না। লবণ বাড়লে মাটির শক্তিও কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর জমিতে যে লবণ জমা হয়েছিল, তার বড় অংশ এখনও পুরোপুরি অপসারণ হয়নি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজানে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ। অনেক এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি উৎপাদনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে কৃষিজমির মাটিকেও নষ্ট করছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বটিয়াঘাটার নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে থাকলেও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সব নমুনায় ইলেকট্রিক্যাল কনডাক্টিভিটি (ইসি) ৩ ডিএস/মিটারের ওপরে উঠে যায়। ঝপঝপিয়া নদীতে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৯২ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা রেকর্ড করা হয়, যা সেচের জন্য ক্ষতিকর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে উঠলেই ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। এখন অনেক সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এতে ধানের শিষ চিটা হয়ে যায়, ফলন কমে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা ও পানির সংকটে অন্তত ১২১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন কমেছে প্রায় ৮৫০ মেট্রিক টন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি কৃষক।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম বলেন, লবণাক্ত মাটিতে গাছ পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। এতে মাটিতে অক্সিজেন কমে যায় এবং রোগবালাই বাড়ে। তিনি উঁচু বেড পদ্ধতি, রিজ অ্যান্ড ফারো ও পিট ক্রপিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। সংকটের মধ্যেও কিছু এলাকায় কৃষকেরা নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। বটিয়াঘাটার দরগাতলা গ্রামে দীর্ঘদিন পতিত থাকা জমিতে এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ডিপ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে কৃষকেরা ঝুঁকি নিয়েই চাষ করছেন। স্থানীয় কৃষক কামরান বলেন, জমি ফেলে রাখলে আরও নষ্ট হবে। তাই ঝুঁকি নিয়েই চাষ করছি।
সরকার উপকূলীয় অঞ্চলে ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯৭, ব্রি ধান-৯৯ ও বিনা ধান-১০-এর মতো লবণসহিষ্ণু ধানের জাত সম্প্রসারণ করছে। আগামী পাঁচ বছরে খুলনা অঞ্চলে ৬০ হাজার হেক্টর জমি নতুন করে চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লবণসহিষ্ণু বীজ দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, বিকল্প সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। কারণ আইলার প্রায় দুই দশক পরও খুলনার উপকূলীয় কৃষকের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এখনও মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা তীব্র লবণাক্ততা।