স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী নির্ধারণ ও কৌশল ঠিক করতে তৎপর রাজনৈতিক দলগুলো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আইন সংশোধনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সেই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণের তৎপরতা চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়া সরকারি ও বিরোধী দুই শিবিরেই পৃথকভাবে প্রার্থী নির্ধারণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ দলগতভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আবার কেউ কেউ প্রার্থী চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে পৃথকভাবে প্রস্তুতি নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তারা জোটগতভাবে আলোচনার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বিশেষ করে বিরোধী শিবিরের দলগুলোর নেতাদের কথায় ভিন্ন এক কৌশলের কথা উঠে আসছে। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলগতভাবে করার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করার আভাস দিচ্ছেন তারা।
বিরোধীদলীয় তথা ১১ দলীয় জোট স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দ্বৈতনীতির কৌশল নিতে যাচ্ছে তা শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য থেকে অনেকটাই পরিষ্কার হওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি জোটের প্রধান শরিক বিএনপির পক্ষ থেকে এখনও জোরালো তৎপরতা শুরু না হলেও শরিকদের মধ্যে কিছু কিছু দল নিজ দলের মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যদি শরিকদের নিয়ে আলোচনার আগ্রহ না দেখায় তাহলে বাকিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার প্রস্তুতিও রাখছে। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পরেই জোটের তৎপরতা শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর ঘোষণা সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসার আগে থেকেই নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের তৎপরতা শুরু হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে দলীয় প্রশাসক বসানোর পর দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তোলা হয় বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে। এক্ষেত্রে ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির তৎপরতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত ২৯ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটিসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। বাকি সিটিগুলোতেও শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণার কথা জানান দলটির নেতারা। এ ছাড়া ১০ মে দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থী ঘোষণা এনসিপি। এর মধ্যে ৩৩টি পৌরসভার মেয়র, ৬৭টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে দলটি প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আসন্ন ঈদুল আজহার আগে ২৫ মের মধ্যে আরও ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
এদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচন এককভাবে করার বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত করে প্রার্থী নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বেশিরভাগ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদপ্রার্থী ঠিকও করে ফেলেছে দলটি। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবেও প্রার্থী ঘোষণার কাজ চলমান রয়েছে দলটিতে। শুধু এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীই নয়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টিও একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে সরকারি জোটের দলগুলোর মধ্যে জোরালো কোনো তৎপরতা দেখা না গেলেও দলীয়ভাবে তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলগুলোর মধ্যে যে প্রস্তুতি চলছে তাতে দুই ধরনের অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের কাজ চলমান আছে। সিটি করপোরেশনের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। যেকোনো সময় ঘোষণা দেব। আর স্থানীয় সরকারের বাকি পর্যায়ের প্রার্থীদের নাম, পরিচয় প্রত্যেক ইউনিট উদ্যোগ নিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে।’ তবে ১১ দলীয় লিয়াজোঁ কমিটির দায়িত্বে থাকা জামায়াতে ইসলামীর একটি সূত্র দাবি করেছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন এককভাবেই হবে। অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয়ভাবে সমঝোতা হতে পারে। সেটা হবে প্রার্থী বুঝে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে নিজেদের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ঐক্যের মধ্যে আছি। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এনসিপি মনে করে আমাদের এককভাবেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই আমরা এককভাবে আমাদের প্রস্তুতি শুরু করেছি এবং প্রার্থী ঘোষণা করতে শুরু করেছি। যদি নির্বাচনের প্রাক্কালে নানাবিধ বিবেচনায় জোটের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়, তবে আমরা চিন্তা করতে পারি।
এ ছাড়া ১১ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে জাতীয় সংসদের চতুর্থ অবস্থানে থাকা দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এককভাবে প্রস্তুতি নিলেও জোটের মধ্যে আলোচনা হওয়ার বিষয়টি বলছে জোরেশোরেই। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরাও দলীয়ভাবে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ এককভাবে নেওয়া হবে না কি জোটগতভাবে নেওয়া হবেÑ সেই সিদ্ধান্ত জোটের বৈঠকেই চূড়ান্ত হবে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পরেই জোটগত আলোচনা শুরু হবে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের খোঁজ নিচ্ছে বিএনপি
শুধু বিরোধী শিবিরেই নয়, সরকারি জোটের মধ্যেও পৃথকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলগুলো। এক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের ধারাবাহিকতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সাফল্য ধরে রাখতে চায় বিএনপি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুত এবং তৃণমূলের কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে। জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য এবং বিতর্কমুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ দলীয় প্রতীক না থাকায় ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।
এদিকে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও আগেভাগে মাঠে নেমে পড়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন তারা।
পৃথক প্রস্তুতিতে জোট সঙ্গীরাও
পৃথকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা মনে করি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক উত্তোলনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা এই নির্বাচনে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ করব। তারপরও চলার পথে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের যারা ছিলেন, বিশেষ করে বিএনপির বাইরে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকবে।
আরেক শরিক গণসংহতি আন্দোলনও নিজেদের মতো করে কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন দলটির নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল। গতকাল শুক্রবার তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজ নিতে অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ কমিটি করা হয়েছে, তারা কাজ শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৫ উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১ জেলা পরিষদের প্রায় সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। গত ৯ এপ্রিল সংসদে ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘উপজেলা পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার পৌরসভা সংশোধন বিল, ২০২৬’ এবং ‘স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন সংশোধন বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এখন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে ইসি।