× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে চৌদ্দগোষ্ঠীর খোঁজ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ১০:০৩ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

জনপ্রশাসনে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় এতদিন মূল ভিত্তি ছিল কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, সততা ও চাকরিজীবনের মূল্যায়ন। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক বাস্তবতায় সেই কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে এক বিস্তৃত তথ্য-অনুসন্ধান, যাকে অনেকেই অভিহিত করছেন ‘চৌদ্দগোষ্ঠীর খোঁজ’ হিসেবে। যেমনÑ পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এবার শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, বরং সংগ্রহ করা হচ্ছে তাদের পরিবারের বিস্তৃত সামাজিক ও পেশাগত মানচিত্র। একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমন তথ্য চাহিদাকে অদৃশ্য নজরদারি ও নতুন ফিল্টার বলে প্রশাসনের একাধিক সূত্র দাবি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় নতুন সরকারের আমলে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে গিয়েও তার বিস্তৃত পারিবারিক বৃত্ত, এমনকি ‘চৌদ্দগোষ্ঠী’ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ। এতে কর্মকর্তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর থেকে শুরু করে বাবা-মা, ভাইবোন, মামা-খালা, চাচা-ফুফু এবং তাদের সন্তানদের পেশা, কর্মস্থল ও ঠিকানাসহ বিস্তৃত তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এমনকি কর্মকর্তার স্ত্রী, সন্তান এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার খুঁটিনাটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই তালিকায়। ইতোমধ্যেই প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে এই উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। অনেক ক্যাডার কর্মকর্তা এটিকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘হয়রানিমূলক’ বলে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি প্রশাসনে ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’ যাচাইয়ের নতুন কৌশলও হতে পারে। তবে সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়া ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা অতিক্রম করছে এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

কী কী তথ্য চাওয়া হচ্ছে বা হয়েছে

জনপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতি শুরু হবে শিগগিরই। এজন্য মাসখানেক ধরে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রাপ্ত একটি তথ্যফরম অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যেসব তথ্য চাওয়া হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছেÑ জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, বর্তমান ও স্থায়ী পূর্ণ ঠিকানা। বাবা-মার নাম, পেশা, কর্মস্থল ও ঠিকানা, ভাইবোনদের বিস্তারিত তথ্য। মামা-খালা ও তাদের সন্তানদের তথ্য, চাচা-ফুফু ও তাদের সন্তানদের তথ্য। স্ত্রীর নাম, পেশা ও কর্মস্থল, সন্তানের শিক্ষাগত ও পেশাগত তথ্য। নিজের শিক্ষাজীবনের পূর্ণ বিবরণ (এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত)। এই তথ্যগুলো শুধু মৌলিক পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান সম্পর্কেও বিশদ জানতে চাওয়া হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়াÑ ‘এটি অপ্রয়োজনীয় ও বিব্রতকর’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এক যুগ্ম সচিব ও উপসচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মামাতো ভাই কোথায় চাকরি করেন কিংবা খালাতো বোনের স্বামীর পেশা কীÑ এসব তথ্য পদোন্নতির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা বোধগম্য নয়। এটি অত্যন্ত বিব্রতকর।

তারা আরও জানান, ব্যক্তিগত জীবনের এমন গভীরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা আগে কখনও দেখেননি তারা। এতে মনে হচ্ছে, পেশাগত দক্ষতার চেয়ে পারিবারিক পরিচয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সচিবালয় থেকে মাঠপ্রশাসনে কর্মরত বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি এক ধরনের প্রোফাইলিং, যার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে, কে কোন মতাদর্শের কাছাকাছি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ছায়া

মাঠপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট একাধিক তথ্য বলছে, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এসব তথ্য সংগ্রহ উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও উঠে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনে পুনর্বিন্যাস ও আনুগত্য যাচাইয়ের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অতীতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ টেনে বলছেন, বাংলাদেশে বড় ধরনের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে দলীয় প্রভাব, আনুগত্য ও পুনর্বিন্যাসের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করে। তার আগে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই সময় মাঠপ্রশাসন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। এমন অভিযোগ তৎকালীন বিএনপির পক্ষ থেকেই প্রকাশ্যে করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে কৌশল হিসেবে হয়তো নতুন সরকারের এই উদ্যোগের সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনে পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে এই ধরনের তথ্য সংগ্রহ শুরু হতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অতীতে দেখা গেছে যখনই বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, তখনই প্রশাসনে আনুগত্য যাচাইয়ের প্রবণতা দেখা যায়। তবে এবার যেটা হচ্ছে, তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিস্তৃত।

আইনি সীমারেখা, গোপনীয়তা ও প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের তথ্য সংগ্রহ ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। সংবিধানে নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও সরকারি চাকরিতে কিছু মাত্রায় তথ্য যাচাই স্বাভাবিক, তবে তা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে; তা নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। যদি এই তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি না থাকে, তাহলে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই অবশ্যই রাষ্ট্রের অধিকার। তবে সেই যাচাই যদি ব্যক্তির পেশাগত সীমা অতিক্রম করে তার বিস্তৃত পারিবারিক বলয় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে তা সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বাসগৃহ ও যোগাযোগের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্র কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে সেটির একটি সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি, যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা ও নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে। অন্যথায় এটি ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ড. ইসলাম মনে করেন, পদোন্নতির মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তার দক্ষতা, সততা, কর্মসম্পাদন ও পেশাগত আচরণই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত। কোনো কর্মকর্তার মামাতো ভাই বা দূরসম্পর্কের আত্মীয় কোথায় কী করেন, সেটিকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মূল্যায়নের মানদণ্ড বানানো হলে তা মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি, অনাস্থা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পদোন্নতি একটি পেশাগত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। এখানে কর্মকর্তার দক্ষতা, কর্মদক্ষতা, সততা ও নেতৃত্বগুণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। পারিবারিক পটভূমি বা আত্মীয়স্বজনের তথ্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে তা মেধাভিত্তিক প্রশাসনের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ যদি স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে তা প্রশাসনে অনাস্থা সৃষ্টি করতে পারে। কর্মকর্তারা মনে করতে পারেন, তাদের ওপর অযাচিত নজরদারি চলছে। যেকোনো তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘নিড টু নো’ নীতি অনুসরণ করা উচিত; যা প্রয়োজন নেই, তা সংগ্রহ করা উচিত নয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দীন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা থাকবেন, তাদের পটভূমি সম্পর্কে জানা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সেই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও পরিধি হতে হবে যৌক্তিক ও সীমিত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এই প্রক্রিয়া অতিরিক্ত বিস্তৃত হয় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে, তাহলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি ও অসন্তোষ তৈরি হলে প্রশাসনিক কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও ব্যবহার সম্পর্কে সরকারকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। তথ্যগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, কে ব্যবহার করবে এবং কত দিন পর্যন্ত রাখা হবেÑ এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, সরকারপক্ষের একাধিক সূত্র বলছে, এটি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা। তবে তারা স্বীকার করেছেন, বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা প্রয়োজন ছিল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা