শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে শুক্রবার গুলশান ২ চত্বরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে গুলশান সোসাইটি। ছবি: আলী হোসেন মিন্টু/প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘আমি আর বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’ এই বুকফাটা আর্তনাদ, ধর্ষক ও খুনের শিকার শিশুসন্তানকে হারানোর তীব্র শোকে পাথর এক অসহায় পিতা। এই ক্ষোভোক্তি যেন গোটা জাতির হৃদয়ের রক্তক্ষরণের প্রতিধ্বনি।
ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সাত বছরের ছোট্ট শিশু রামিসার ওপর যে অবর্ণনীয় বর্বরোচিত যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং শেষে তাকে গলা কেটে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা দেশের প্রতিটি মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। শোকে স্তব্ধ পুরো দেশ, আর ক্ষোভে ফুঁসছে প্রতিটি জনপদ। শোকে পাগলপ্রায় পিতা আবদুল হান্নানের কান্নাজড়িত ওই একটি বাক্য এ দেশের বিচারব্যবস্থা ও সমাজের রূঢ় বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে।
তবে, এই অসহায়ত্বকে মেনে নেয়নি দেশের মানুষ। মর্মান্তিক এই ঘটনার ন্যায়বিচারের দাবিতে ঢাকা থেকে শুরু করে টেকনাফÑ সারা দেশ আজ ক্ষোভে উত্তাল। সামাজিক মাধ্যমের তীব্র প্রতিক্রিয়া গড়িয়েছে রাজপথের আন্দোলনে। সবার একটাই অবিচল দাবিÑ ধর্ষক ও খুনি সোহেল রানার দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নরপিশাচ এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়।
মিরপুরে ক্ষোভের দাবানল, অবরুদ্ধ রাজপথ
ঘটনার পর থেকেই পল্লবীর সাত নম্বর সড়কে রামিসাদের বাসার সামনে শোক ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। দিনভর সেখানে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং রামিসার ছোট্ট সহপাঠীরা। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা পল্লবী থানায় ঢুকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং কালশী সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে দেয়। গতকাল শুক্রবার এই ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। জুমার নামাজের পর একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিশুটির বাসার সামনে গিয়ে শেষ হয়। একই দিন বেলা পৌনে ৩টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ‘এলাকাবাসীর’ ব্যানারে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে শিশু হত্যাকারীর ফাঁসি এবং দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে। এতে মিরপুর সড়কে যান চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। মিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। এর আগে দুপুর সোয়া দুইটার দিকে শিশুটির বাসার অদূরে মানববন্ধনের আয়োজন করে ‘বি-১১ সমাজকল্যাণ যুব সংগঠন’ এবং শিশুটি যে স্কুলে পড়াশোনা করত, সেই স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
দায়ী বিচারহীনতার সংস্কৃতি
সমাজের সচেতন মহলও এই বর্বরতার বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। গতকাল সকালে রামিসা হত্যার ন্যায়বিচারের দাবিতে গুলশান ২-এর গোলচত্বরে মানববন্ধন করেছে গুলশান সোসাইটি। মানববন্ধনে বক্তারা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, শিশু রামিসার ওপর যে পৈশাচিক বর্বরতা চালানো হয়েছে, তা কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না। আমরা প্রতিবারই দেখি, এ ধরনের নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর আইনের নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। তারা বলেন, অবিলম্বে ধর্ষক ও খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে আমাদের কোনো সন্তানই নিরাপদ থাকবে না। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার কার্যকর করতে হবে। মানববন্ধনে গুলশান সোসাইটির মহাসচিব মুজিবুর রহমান মৃধা, আম্বালা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আরিফ সিকদারসহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
একই দিন বিকালে ঢাকার কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারার সামনে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন করে ‘প্রথম আলো বন্ধুসভা’। এ ছাড়া একই দাবিতে সারা দেশের আরও ৩১টি স্থানে একযোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি।
সর্বত্রই প্রতিবাদের ঝড়
কক্সবাজার: গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সকালে ‘খেলাঘর আসর’, বেলা ৩টায় শহিদ মিনারে ‘প্রতিবাদী নারী জোট’, বিকাল ৪টায় পৌরসভা চত্বরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিকাল সাড়ে ৫টায় ‘প্রথম আলো বন্ধুসভা’ বিক্ষোভ করে। জেলার টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় একযোগে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়। বক্তারা শিশুদের বাসযোগ্য দেশ তৈরিতে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রকে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
বরিশাল: গতকাল সকালে অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “গত ৭ দিনে দেশে চারজন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করেÑ রাষ্ট্র শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।”
মেহেরপুর: গতকাল বিকালে প্রেস ক্লাবের সামনে জেলা ভিবিডি এবং ন্যাশনাল চিলড্রেন্স টাস্কফোর্সের (এনসিটিএফ) উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, এমন জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদই পারে অপরাধীদের রুখে দিতে।
অন্যান্য স্থান: গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় সাধারণ বীমা করপোরেশন ভবনের সামনে সামাজিক সংগঠন ‘খেলাঘর’ মানববন্ধন করে। খুলনার কয়রা উপজেলা পরিষদের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে বন্ধুসভা। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জুমার নামাজের পর ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে ‘খুন, ছিনতাই ও ডাকাতি বন্ধ করতে হবে’ এবং ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’ স্লোগানে প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সিরাজদিখানে স্বজনদের আহাজারি: নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহত শিশুর গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে নেমে এসেছে শোকের বিষাদঘন ছায়া। বুধবার রাতে সিরাজদিখানে পারিবারিক কবরস্থানে রামিসাকে দাফন করা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে রামিসার কবর জিয়ারত করতে যান তার বাবা ও মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শোকার্ত বাবাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেন সংসদ সদস্য। তিনি এ সময় পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সান্ত্বনা ও সরকারের কঠোর অবস্থান: বৃহস্পতিবার রাতে শিশুটির শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাদের পল্লবীর বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় রামিসার মা, বাবা ও বড় বোন উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের গভীর সমবেদনা জানান এবং এই অমানবিক ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী ওই বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, “আমরা পরিবারকে আশ্বস্ত করেছি। পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। এখন অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার পালা।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আরও জানান, “অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে ডিএনএ টেস্ট করা বাধ্যতামূলক। আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডি ল্যাবে সেই কাজ চলছে। ডিএনএ টেস্টের নিয়মানুযায়ী ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে। আশা করছি, রবিবার দুপুরের মধ্যে তা শেষ হবে এবং রবিবারের মধ্যেই আমরা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারব। এরপর অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে বিচারকাজ শেষ করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে সেই সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে।”
এদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। তার স্বভাবচরিত্র ও অতীত রেকর্ড কোনোটিই ভালো নয়। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হবে।
ঢাকার পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিশু রামিসার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে নেমে পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে বুধবার দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি জানান, শিশুটিকে পাশবিক কায়দায় ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাটের জন্য নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এই ঘৃণ্য অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন অকাল ও বীভৎস মৃত্যু পুরো সমাজব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেশের প্রতিটি মানুষের একটাই প্রতীক্ষাÑ দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুততম বিচার। রামিসার বাবার ‘বিচার চাই না’ বলে যে হতাশার আর্তনাদ, রাষ্ট্র যেন তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সেই আর্তনাদকে ভুল প্রমাণ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, দেশবাসী আজ সেই অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে।