বাজেট
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন বরাবরই বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা। এবার সমস্যা আরও প্রকট হবে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণীত হচ্ছে সংকটময় সময়ে। এই সংকটের একটি অভ্যন্তরীণ, অপরটি বৈশ্বিক। উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে বিএনপি সরকার। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব দেশের অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এমন কঠিন সময়ে বাজেট দিতে হচ্ছে নতুন সরকারকে। সবাই ধারণা করেছিল, একটি সাশ্রয়ী বাজেট দেবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জোট সরকার। কিন্তু সে পথে না হেঁটে বিশাল ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে একটি বড় বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী, যিনি একই সঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রীও।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন, আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকছে। প্রস্তাবিত বাজেট তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এটি গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় টাকা কোথা থেকে আসবে, তা পরিষ্কার করেননি অর্থমন্ত্রী।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন বরাবরই বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা। এবার সমস্যা আরও প্রকট হবে। কারণ আগামী বছরও সংকুচিত ধারায় থাকবে অর্থনীতি। ফলে রাজস্ব আয় বাড়ার সুযোগ নেই। আবার বৈশ্বিক কারণে বিদেশি সাহায্যপ্রবাহে ঘাটতি হবে। দেখা যাচ্ছে, অর্থায়নের দুটি উৎসই দুর্বল অবস্থায়। ফলে নতুন বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আছে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। টানা তিন বছর ধরে অর্থনীতির গতি শ্লথ। এই গতি বাড়াতে হবে। এসব বিবেচনা মাথায় রেখে বাজেটের আকার বড় রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
আগামী অর্থবছরে বড় বাজেট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কারে সময়ের প্রয়োজন। তবে দারিদ্র্য বিমোচন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্যই বড় বাজেট দেওয়া দরকার। কারণ ব্যয় বৃদ্ধির দরকার। অর্থনীতি যে জায়গায় আছে, একে ওপরের দিকে নিয়ে না গেলে চলবে না। সম্প্রতি ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আগামী অর্থবছরের বাজেটের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই আয়োজিত পরামর্শক কমিটির বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। নতুন বাজেটে যে সুযোগ-সুবিধা তেমন মিলবে না, সে আভাসও দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেটে ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ-সুবিধা হয়তো দিতে পারব না। তবে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী যে আভাস দিলেন তাতে ধারণা করা হচ্ছে, বাড়তি রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য তিনি এবার জনগণের ওপর করের বোঝা চাপাবেন। এরই মধ্যে সম্পদ কর চালু, মোটরবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। আবার বিতর্কিত সেই সুযোগ কালো টাকা সাদা করার ঘোষণাও আসতে পারে। মূল্য সংযোজন করের আওতা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। সবকিছু মিলে আগামী বাজেটে বাড়তি কর আহরণে সাহসী পদক্ষেপ নেবেন অর্থমন্ত্রী এমনও আভাস মিলছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, অর্থমন্ত্রীর সামনে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমেনি, মানুষের আয় চাপে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানির সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে? মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, জ্বালানিÑ এসব বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে সমাধানের পথ দেখাতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বড় বাজেটের দিকে নজর বেশি না দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ও গুণগত মানসম্পন্ন বাজেট করতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকতে হবে। তাহলে এর সুফল সবাই পাবে।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএর সাবেক সভাপতি বর্তমানে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে প্রধানত চারটি চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছেÑ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও জ্বালানি সংকটের সমাধান। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে অর্থমন্ত্রীকে।
সম্ভাব্য আকার
বিভিন্ন খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাথমিকভাবে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আগামী অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে) আগের বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। পরে তা সংশোধন করে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। সে হিসাবে আগামী বাজেট চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হচ্ছে। অতীতে সাধারণত প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাজেট বাড়ানো হলেও গত অর্থবছর ছিল ব্যতিক্রম। এরই মধ্যে এনইসির সভায় ৩ লাখ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী এডিপি পাস হয়েছে, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড়। সরকারের এ বাড়তি ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা চলতি বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।
ঘাটতি
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় চলতি বাজেটে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন বাজেটে এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
জিডিপি ও মূল্যস্ফীতি
নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার বেড়ে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। চলতি বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
সংকটময় অর্থনীতির পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এই বিশাল বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন থাকলেও, মূল শঙ্কা অর্থায়ন নিয়ে। ঘাটতি মেটাতে জনগণের ওপর করের চাপ বৃদ্ধি এবং বিশাল অঙ্কের ঋণের পথেই হাঁটতে পারে সরকার।