× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্যে অপরূপ আলিয়ঁস

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ১০:৫৪ এএম

আপডেট : ২২ মে ২০২৬ ১৫:৩৭ পিএম

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে চলছে সংস্কৃতি গবেষক ও লোকশিল্প সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামানের ‘পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য’ শীর্ষক মৃৎশিল্প প্রদর্শনী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে চলছে সংস্কৃতি গবেষক ও লোকশিল্প সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামানের ‘পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য’ শীর্ষক মৃৎশিল্প প্রদর্শনী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কুম্ভ সংস্কৃত শব্দ; যার বাংলা ‘মাটির কলসি বা কলস বা ঘট’। কুম্ভের নীচের অংশ গোলাকার এবং উপরের দিকে সরু গ্রীবা এবং গ্রীবার উপরে শেষে থাকে গোলকার মুখ। গোলাকার মুখের অংশ বাইরের দিকে কিছুটা প্রসারিত; যাকে ‘কান্দা বা কানা’ বলা হয়। তৃষ্ণায়-প্রেমে-অপ্রেমে-ঘুমে-জাগরণে মানুষের একসময় সম্বল ছিল ‘কুম্ভ বা কলস/কলসি/ঘট’।

ঢাকার মিরপুর রোডের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত আবহমান বাংলার সংস্কৃতি গবেষক ও লোকশিল্প সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামানের ‘পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য’ শীর্ষক মৃৎশিল্প প্রদর্শনীতে একটি বৃহদাকার এই ‘কুম্ভ’ দেখেই আমিনা অবন্তী উচ্ছ্বাসিত উচ্চস্বরে বলে উঠলোÑ ‘আরে; এটাতো হাঁড়া (মাটির বড়ো পাত্র; পাথর, ধাতু বা মাটির তৈরি বড়ো কলসি)। এতো বড়ো হাঁড়া বহুদিন পরে দেখলাম। আমাদের কালো পাথরের তৈরী একটা বিশাল হাঁড়া ছিল, এখন নেই। অবন্তীর পাশের জন ‘অবন’ বলে উঠলোÑ আমাদেরও এর চেয়ে অনেক বড়ো একটা কালো পাথরের হাঁড়া ছিল; এখন নেই- ভেঙে গেছে। কুষ্টিয়া-মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা অর্থাৎ বৃহত্তর কুষ্টিয়ার দিকে এটাকে সাধারণত ‘হাঁড়া বলে, কিন্তু অনেকে ‘কুম্ভ’ বলে। আর ছোটগুলোকে কলস বা কলসি আর কলসের চেয়ে ছোটগুলোকে ‘ঘট’ বলে।

অবন্তী প্রশ্ন ছুড়ে বলে- কলসি, ঘট- শুনেছি; কিন্তু ‘কুম্ভ’ নামটি তেমন শুনিনি। এরপর সে (অবন্তী) যে পাশে থেকে ‘কুম্ভ’ দেখছিল তার উল্টো দিকে একটা কাগজ টানানো দেখে ছুটে গিয়ে দেখলো; সেখানে ‘কুম্ভ’র পরিচিতি লেখা। পরিচিতি পড়া শেষ হতেই বড়ো কুম্ভ’র পাশে একটা কালো রঙের একটা ছোট কুম্ভ দেখে মহা-আনন্দে বলে উঠলোÑ এই যে; এটাকে আমরা কলস বা কলসি বলি। এতে পানি রাখলে; পানি ঠান্ডা থাকে। অবন বললো- এটা দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই এটাকে কলস বা কলসি বলে। এই মাটির কলসের প্রচলন এখন কমে গেছে। যতটুকু মনে পড়েÑ একসময় প্রায় বাড়ির বাইরের দিকে ঘরে (বৈঠকখানা বা পিঁড়িতে) এই কলসে পানি রেখে দিতো; যাতে রলতি পথে তৃষ্ণার্ত পথিক তার তৃষ্ণা মেটাতে পারে। টিউবওয়েলের পর্যাপ্ত প্রচলনের পর চলন্ত পথিকদের জন্য এভাবে পানি রাখার এই সংস্কৃতি এখন বিলুপ্ত প্রায়।

অবন আর অবন্তীর এই আলাপ-আলোচনা শেষ না হতেই লেখক, আবহমান বাংলা সংস্কৃতি গবেষক ও লোকশিল্প সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামান একটু দূর থেকে বলে উঠলেনÑ হ্যাঁ, টিউবওয়েলের ব্যপক প্রচলনের ফলে আমাদের (বাঙালির) মাঝে থেকে এই সংস্কৃতি উঠে গেলেও পাহাড় অঞ্চলে এখনও এটা টিকে আছে। পাহাড়ী অঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠী এখনও পথিকদের জন্য এভাবে পানি রাখে। পানি রাখার এই পাত্রকে মারমারা ‘কারাহ’ এবং ‘রিফুংজং’ বলে। তবে পাহাড়ী অঞ্চলেও এই সংস্কৃতি কমে আসছে। কমে আসছেÑ আমাদের আবহমান বাংলার এরকম পরিবেশ বান্ধব হাজারও মৃৎশিল্পর ব্যবহারও।

তারপর তিনি (ইমরান উজ-জামান) পানি রাখার এই ‘কুম্ভ’ বা কলস বা হাঁড়া নিয়ে ইতিহাসের বিস্তারিত শোনালেন অকপটে। অবন ও অবন্তীকে গাইডের মতো ঘুরিয়ে দেখালেনÑ রাজশাহী অঞ্চলের ‘টেপা পুতুল’, মানিকগঞ্জের বড় মাথালসহ বিভিন্ন মৃৎশিল্প, পিরোজপুরের বাওফলের মাটির জগ-গ্লাস-কাপ-পিরিচ-বাটিসহ বিভিন্ন পাত্র, কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলি অঞ্চলের মাটির তৈরী নান্দনিক গরু, নড়াইলের মিষ্টির হাড়ি, মুন্সিগঞ্জের ষোলঘরের মাটির তৈরি ফল-মূল-শাক-সবজি (কেটফল), যশোরের গুড়ের হাড়িসহ বিভিন্ন মৃৎশিল্প, কুষ্টিয়ার মাটির তৈরি ভাতের হাড়ি, কলসসহ বিভিন্ন মৃৎশিল্প, ঝালকাঠির নবগ্রামের নন্দন ঘট-সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় সবগুলো ধারার ‘সরাচিত্র’ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবহৃত মৃৎশিল্প দিয়ে সাজানো পুরো প্রদর্শনীর স্থলের অজস্র মৃৎশিল্প। সঙ্গে মৃৎশিল্পের পরিচিতিও তুলে ধরলেন ইমরান উজ-জামান। তাদের আলাপ-আলোচনা শুনতে শুনতে এবং মৃৎশিল্প দেখতে দেখতে চোখ গেল- একটা বৃহৎ আকৃতির মাটির তৈরি বাঘকে ঘিরে ধরে আছে বেশ কিছু ঘোড়া! যে দৃশ্য বাস্তবে একেবারেই কল্পনাতীত। ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকার পরিচয় দিয়ে প্রদর্শনীর মৃৎশিল্পের সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামানের কাছে বাঘের চেয়ে অতিক্ষুদ্রকায় এই শক্তিশালী ঘোড়াগুলো দেশের কোন অঞ্চলের? -জানতে চাইলে তিনি হাসতে হাসতে ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’কে বললেনÑ ছোট অথচ শক্তিশালী ঘোড়াগুলো মানিকগঞ্জের। আর বাঘটি সুন্দরবন অঞ্চলের বনবিবি মেলা থেকে সংগৃহিত। তার ঠিক পাশের চায়ের কেটলি, হুকা, ঘট, ফুলদানিসহ বেশকিছু অসাধারণ নান্দনিক মৃৎশিল্প দেখিয়ে বললেন- এগুলো টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চলের। এর ঠিক পাশের পুতুলপরী-সহ বিভিন্ন প্রকার নান্দনিক পুতুল দেখিয়ে জানালেন- এগুলো মানিকগঞ্জের তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য।

আজ শেষ হবে গত ১৮ মে শুরু হওয়া দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের এই প্রদর্শনী। মাত্র পাঁচদিনের এই প্রদর্শনীর আয়োজন নিয়ে ইমরান উজ-জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের গৌরবের এই মৃৎশিল্প আজ শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। সিনথেটিক পন্যের সহজলভ্যতা, কম দাম ও চকমকে বিজ্ঞাপন মাটির পন্যকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে প্রচার ও বাজারজাতকরণের সুবিধা না থাকায় দেশী কাঁচামালে তৈরি এসব পণ্যর ব্যবহার ব্যপকভাবে কমে যাচ্ছে। যার কারণে মৃৎশিল্প পেশা বিলুপ্তির পথে, কর্মহীন হচ্ছে শিল্পীরা। অন্যদিকে সিনথেটিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও মানব জীবনে ভর করেছে ক্যানসারের মতো নানা রোগ। এ থেকে বাঁচতে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে পরিবেশবান্ধব আমাদের ভূমির কাঁচামালে তৈরি পন্য নিজে ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্যবাহি মৃৎশিল্পের সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়া এবং মৃৎশিল্পের প্রচার ও প্রসারে জন্য এই প্রদর্শনীর আয়োজন। যার নাম ‘পোড়ামাটির রূপ বৈচিত্র’ মেলা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা