× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চাপে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য

আহমেদ তোফায়েল ও তানভীর হাসান

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১০:১০ এএম

চাপে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চাপে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেছে পোশাক কারখানাটির সেলাই মেশিনের চেনা শব্দ। মাসের কয়েক সপ্তাহ পেরোলেও বেতন পৌঁছেনি শ্রমিকদের হাতে। কারণ প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যাংক হিসাব আইনি তদন্তের স্বার্থে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা যাচ্ছে না, সরবরাহকারীরা বকেয়া টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন আর বিদেশি ক্রেতারা বারবার হুমকি দিচ্ছেন অর্ডার বাতিলের।

অপরাধের উৎস সন্ধান এবং কালো টাকার বিস্তার রোধে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কঠোর অবস্থান যখন জরুরি হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই অন্যদিকে দেখা দিচ্ছে প্রচণ্ড এক মানবিক সংকট। অপরাধীর সম্পদ ক্রোকের এই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে বৈধ ব্যবসা, সাধারণ শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা যেন স্থবির হয়ে না পড়েÑ আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেটি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। 

পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের আইনি অভিযানের এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে, যেটিতে এই মানবিক সংকটও ধরা পড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত ১৫ মাসের এক বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে কেবল জমি এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ মিলিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি ৩৬ লাখ ১২ হাজার ১৭২ টাকার বিশাল সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

এই আইনি অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ‘ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম’ বা আর্থিক অপরাধের উৎসগুলো বন্ধ করা। তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৩৮ হাজার ৫৯৭ শতাংশ জমি ক্রোক করা হয়েছে। এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ২১৬ কোটি ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। ফসলি জমি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্লটÑ সবই রয়েছে এই তালিকায়। একই সঙ্গে অবৈধ অর্থ লেনদেন বন্ধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের ৪২১টি অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করা হয়েছে, যেখানে জমা ছিল প্রায় ৩২৯ কোটি ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭২ টাকা।

তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের এই পদক্ষেপকে দেশের সুশাসনের স্বার্থে অনেকে প্রয়োজনীয় বললেও, এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে। শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যাংক হিসাব একটি প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। কাঁচামাল কেনা, আমদানি ব্যয় পরিশোধ, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া কিংবা দৈনন্দিন সাধারণ লেনদেনÑ সবই এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাব তদন্তের অংশ হিসেবে হঠাৎ জব্দ করা হচ্ছে, তখনই সেটির আর্থিক কার্যক্রম থমকে যাচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। আর এর ফলে উৎপাদনমুখী শিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাজারে নগদ প্রবাহের সংকট তৈরি হয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানে। এমনিতেই গত দেড়-দুই বছরে দেশে নতুন কোনো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। 

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংক হিসাব দীর্ঘ সময় জব্দ থাকার কারণে নতুন করে কোনো ব্যাংকঋণ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে সরবরাহকারীরাও বকেয়া আদায়ের অনিশ্চয়তায় পড়ছেন এবং কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বৈদেশিক বাণিজ্য বা রপ্তানি খাতে। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে আগেই সম্পন্ন চুক্তিগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বড় বড় রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে এর মানবিক দিকটি থমকে যাওয়ার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন কারখানার শ্রমিকদের সময়মতো বেতন পরিশোধ করা যায় না। মাসের শেষে মজুরি না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এতে কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ আরও জটিল হয়ে ওঠে। অর্থনীতিতে যখন এমনিতেই মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ রয়েছে, তখন শিল্প খাতের এই অচলাবস্থা অর্থনৈতিক সংকটকে নতুন করে ঘনীভূত করছে।

অপরাধের উৎস বনাম বৈধ সাম্রাজ্যের পতন : সিআইডি সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মূলত অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশের ভেতরে বা বাইরে যেন ব্যবহার করা না যায়, সে কারণেই এ পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অবরুদ্ধ করার ফলে অপরাধী চক্রের আর্থিক সক্ষমতা বা তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

সিআইডির তথ্যমতে, মোট ৩৫০ কোটি টাকার সমমূল্যের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০ শতাংশ জমি এবং আবাসন খাতের বড় বড় স্থাপনা ছাড়াও রয়েছে ২০টি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট ও কারখানা। এই তালিকায় বস্ত্র খাতের ১১টি টেক্সটাইল মিল ও ৯টি অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ ২৩টি বিলাসবহুল গাড়িও রয়েছে, যার মোট আর্থিক মূল্য ২৫ কোটি ৩২ লাখ ৬২৮ টাকা। এ ছাড়া আরও ৮ কোটি ১০ লাখ টাকার সমমূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সিআইডি বলছে, এই গাড়ি ও ব্যাংক-ব্যালেন্সের মালিকরা সমাজের উচ্চস্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তবে প্রাথমিক সরকারি এই পরিসংখ্যানে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

নীতিগত বৈপরীত্য ও উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ : এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের পূর্ববর্তী কিছু আশ্বাসের বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে না এবং আগামীতেও করা হবে না। অতি উৎসাহিত হয়ে কেউ এমনটা করলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা নয়।’ কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে, আইনি তদন্তের প্রয়োজনে হিসাব জব্দের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

সম্প্রতি দেশের বস্ত্র খাতের শীর্ষ সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল দেশের বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নীতিসহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবান্ধবনীতির অভাবে দেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণে এমনিতেই বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর ওপর এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কারখানা পরিচালনায় চরম হিমশিম খাচ্ছেন এবং অনেক প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধের উপক্রমে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং দেশের বৈধ অর্থনীতি সচল রাখার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য রক্ষা করা দরকার। যারা সুনির্দিষ্টভাবে জালিয়াতি বা অর্থপাচারে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কেবল সন্দেহের বশে বা তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়েই যদি একটি চলমান প্রতিষ্ঠানের সব লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তের স্বার্থে সন্দেহভাজন নির্দিষ্ট কিছু লেনদেন বা হিসাবের একটি অংশ সীমিত রাখা যেতে পারে। কিন্তু কারখানার শ্রমিকদের বেতন, নিয়মিত বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল এবং কাঁচামাল কেনার মতো জরুরি উৎপাদনমুখী ব্যয়গুলো করার জন্য একটি নির্দিষ্ট চ্যানেল খোলা রাখা উচিত। এতে অপরাধের তদন্ত যেমন ব্যাহত হবে না, তেমনি সচল থাকবে উৎপাদন ব্যবস্থা, রক্ষা পাবে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট তৈরি হবে না।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও বিনিয়োগ পরিবেশ : তদন্ত ও হিসাব জব্দ প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যখন নতুন বিনিয়োগকারীরা দেখেন আইনি প্রক্রিয়ার কারণে চলমান ব্যবসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এর ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে।

জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং অপরাধমূলক উপায়ে উপার্জিত কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যেমন দরকার, তেমনই দেশের শিল্প ও সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সুরক্ষাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই পুরো তদন্ত ও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালার প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি বলছেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা