× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উভয়সংকটে এনবিআর

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬ ১৫:২২ পিএম

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে যখন প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা দুই-ই বাড়ছে, ঠিক তখনই এনবিআর এক বড় ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বে পড়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে যখন প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা দুই-ই বাড়ছে, ঠিক তখনই এনবিআর এক বড় ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বে পড়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে আইএমএফের শর্ত মেনে করছাড় প্রত্যাহার ও অভিন্ন ভ্যাট চালুর তীব্র চাপ, অন্যদিকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রেখে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা। নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে যখন প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা দুই-ই বাড়ছে, ঠিক তখনই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক বড় ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বে পড়েছে।

এবার দেশের ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ভারী বোঝা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল রাজস্ব আদায়ের পটভূমিতে এই বাজেট প্রণয়ন হতে যাচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্স্ট কার্ডের মতো সরকারের নতুন কিছু ব্যয়বহুল সামাজিক প্রতিশ্রুতি। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ধাক্কা সরকারকে ভর্তুকি ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করছে। এই বহুমুখী ব্যয়ের চাপ সামলাতে প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের সাম্প্রতিক চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে। যদিও এই আদায় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি, তবুও তা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, বার্ষিক গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সাধারণত ১৪ শতাংশের ওপরে থাকে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়া নতুন কিছু না হলেও, প্রতিবছরই প্রকৃত আদায়ের সাথে লক্ষ্যমাত্রার ব্যবধান ক্রমাগত বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, অর্থবছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ আরও ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থর গতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি ও কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং মূল্যবৃদ্ধি এই দুর্বল রাজস্ব অর্জনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ওয়াশিংটনে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সাথে তাদের সর্বশেষ বৈঠকে সব ধরনের করছাড় প্রত্যাহার এবং সমস্ত খাতে একটি সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন ভ্যাট হার চালুর তাগিদ দিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি সরকারি ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে নেওয়ার পক্ষেও চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার কিছুটা ভিন্ন। সরকারের প্রধান লক্ষ্য এখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্পষ্ট করেই সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের আগামী আর্থিক নীতি এমনভাবে সাজানো হবে, যা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং কাজের সুযোগ তৈরি করবে। অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করেন, কর্মসংস্থান তৈরিকারী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর সুবিধাগুলো বজায় রাখা উচিত। একই সাথে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ও নীতিগত বাধাগুলো দূর করা জরুরি।

ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বর্তমান করব্যবস্থার কিছু অসঙ্গতি দূর করার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে, আয় না থাকলেও বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর আদায়ের নিয়ম এবং আমদানির ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো ব্যবসার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা একটি দক্ষ এবং ব্যবসাবান্ধব কর প্রশাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে এনবিআরের জন্য এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সংস্কারের প্রথম এক বা দুই বছরে সামগ্রিক রাজস্ব আদায় সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে, যা এনবিআরকে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলছে। অন্যদিকে, আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী সব খাতে অভিন্ন ভ্যাট হার কার্যকর করা হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং খাদ্যপণ্যের মতো মৌলিক সেবা ও পণ্যের দাম এক লাফে অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।

কর ছাড় এবং হ্রাসের বিষয়ে নিজেদের দাবি আদায়ে গত ৩১ মার্চ থেকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সাথে দফায় দফায় আলোচনা শুরু করেছে এনবিআর। ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী চেম্বারগুলো তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা এনবিআরের কাছে জমা দিয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) করের আওতা বাড়ানো, করের হার কমানো এবং অটোমেশনের মাধ্যমে একটি সহজ ও হয়রানিমুক্ত কর কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়Ñ এমন কোম্পানির করপোরেট করের হার ২৭.৫ শতাংশ থেকে ২.৫ শতাংশ কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে। নতুন করদাতা শনাক্ত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ট্রেড লাইসেন্স, ভূমি রেজিস্ট্রি এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ডেটাবেজ কেন্দ্রীয়ভাবে এপিআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সমন্বয় করার একটি দূরদর্শী প্রস্তাব দিয়েছে ডিসিসিআই। এ ছাড়া ভ্যাটের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর বিলোপ এবং টার্নওভারের ভিত্তিতে ন্যূনতম কর প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে তারা।

একইভাবে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কনীতি, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ক্ষতি এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রভাব বিবেচনা করে দেশের করনীতি নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়েছে। তারা পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ করের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) করব্যবস্থার একমুখী ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং শুধুমাত্র আয় থাকলেই কর আদায়ের বিধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক সিনিয়র ইকোনমিস্ট এবং পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, মাত্র ৯ মাসেই এত বড় রাজস্ব ঘাটতি সরকারের আর্থিক অবস্থাকে মারাত্মক চাপের মুখে ফেলেছে। আগামী বছরেও অর্থনৈতিক মন্দাভাব বজায় থাকার কারণে প্রচলিত উপায়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না। এর ফলে উন্নয়নমূলক ব্যয়, যা এখন বাড়ানো দরকার, তা সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হবে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে ব্যাহত করবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানও একই সুর মিলিয়ে বলেন, চলতি বছর যেখানে ৪ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে আগামী অর্থবছরের জন্য আবারও ৬ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতাবিবর্জিত।

আইএমএফের চাপ সামলানোর বিষয়ে ড. মাসরুর রিয়াজ সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ঢালাওভাবে করছাড় প্রত্যাহার করলে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে মোটেও অনুকূল হবে না। তাই আইএমএফের সাথে একটি দক্ষ ও কৌশলী দরকষাকষি করতে হবে, যেন আগামী দুই বা তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এই ছাড় কমানো যায়। যেসব খাতে ছাড় ও ভর্তুকি তুললে জনগণের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে না, সেগুলো প্রথমে বিবেচনা করা উচিত। অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানও রাজস্ব সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিয়ে আইএমএফের সাথে পুনরায় আলোচনার পক্ষে মত দেন।

তবে এনবিআর শেষ পর্যন্ত কোনো পথ বেছে নেবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সাথে এক বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাজস্ব প্রশাসন কেবল করের হার কমানোর চেয়ে ব্যবসা পরিচালন সহজ করা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাধা দূর করার দিকে বেশি মনোযোগ দেবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে কর ও ভ্যাটের পরিধি বাড়ানো এবং কিছু খাতের করছাড় কমানোর জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা