সংবিধান সংশোধন
সংসদ ভবন। ফাইল ছবি
সরকারি দল বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম পাওয়া না গেলে তাদের ছাড়াই সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারা চান সবার অংশগ্রহণে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়া গেলে ‘একলা চলো নীতি’ নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষ কমিটি গঠন ও সংবিধান সংশোধন করা হবে। কারণ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে সংবিধানের বেশ কিছু সংশোধন প্রয়োজন।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারে ৩৫টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এ ইশতেহারে। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কারে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যেখানে বিএনপির সাতজন এবং গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে পাঁচজন রাখা হয়েছে। বিরোধী দল থেকে পাঁচজনের নাম পাওয়া গেলে এ কমিটি হবে মোট ১৭ সদস্যের। তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিরোধী দলগুলোকে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানোর ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।
প্রসঙ্গত, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যে ৩৫টি সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার বিধান, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, দুইজন ডেপুটি স্পিকার পদ সৃষ্টি, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী রাখা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, দলনিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দুইজন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেওয়া ইত্যাদি।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করা সম্ভব না হওয়ায় এ সম্পর্কিত কাজ অনেকটা পিছিয়ে গেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, বিরোধী দলের ক্রমাগত অসহযোগিতার কারণে ওই কমিটি গঠন করা যায়নি। আগামী ৭ জুন সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হবে; তখন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নাম দেওয়া না হলেও এই কমিটি গঠন করা হবে।
সংসদে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শীর্ষ ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘বিরোধী দলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব তাদের নিয়েই কমিটি করতে এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে। কিন্তু তারা সহযোগিতা না করলে আমরা তো বসে থাকতে পারব না। জাতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শিগগিরই ১১ দলীয় জোটে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।’ তবে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘জামায়াতের পক্ষ থেকে বিশেষ কমিটিতে কোনো নাম দেওয়া হবে না। আগামী ৭ জুন সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই কমিটিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।’ এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিশেষ কমিটিতে এনসিপির প্রতিনিধিদের নাম দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ তাদের দলও সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে।
উল্লেখ্য, গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংসদের চিফ হুইপ (নুরুল ইসলাম মনি) আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনার বিষয় আছে। এখন মত দিতে পারব না। কারণ আমরা চেয়েছি রিফর্ম (সংস্কার), কিন্তু এখানে হচ্ছে সংশোধন। এই জায়গাটায় আগেও আমাদের মতপার্থক্য ছিল, এখনও এটা রয়েছে। প্রস্তাব ওনারা (সরকারি দল) দিয়েছেন, সেটাকে আমরা নিলাম, শুনলাম। কিন্তু পরে জানাব। এখনই কিছু বলছি না এ ব্যাপারে।’
সরকারি দলের দেওয়া প্রস্তাবের পর ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। সরকারি দলের পক্ষ থেকেও নতুন করে তাগিদ দেওয়া হয়নি। বিরোধী দল নাম না দিলেও সরকারি দল খুব একটা সময় অপেক্ষা করবে না। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেই বিশেষ কমিটি গঠন করে কাজ শুরু করবে। সেক্ষেত্রে সরকারি দল থেকে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে অথবা বিশেষ কমিটির সদস্য সংখ্যা কমিয়ে গঠন করা হতে পারে।
এভাবে এক তরফাভাবে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের নজির জাতীয় সংসদে রয়েছে। নবম জাতীয় সংসদে ২০১০ সালে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেসময় গঠিত বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি তত্কালীন বিরোধী দল বিএনপি। ১৫ সদস্যের কমিটিতে বিএনপির পক্ষ থেকে তিনজন সদস্যের নাম দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। বিএনপি তাতে সাড়া না দিলে তত্কালীন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে তিনি ছিলেন চেয়ারপারসন এবং প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন কো-চেয়ারম্যান। ১৫ সদস্যের ওই কমিটিতে জাতীয় পার্টি (জাপা), ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের একজন করে এমপি ছিলেন। বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়াই ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তসহ আর কিছু সংশোধনী আনা হয়েছিল।
তবে এবারের সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি হচ্ছে আরও বিস্তারিত এবং বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। যেখানে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ প্রাধান্য পাবে। বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া ইস্যু ছাড়া অন্য সবগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিএনপি। তবে ‘সংশোধন না সংস্কার’ এই ইস্যুতে জামায়াত ও এনসিপি সংবিধান সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে দূরে থাকতে পারে।