জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের প্রশাসনে গত দেড় দশকে রাজনৈতিক বিবেচনা, দলীয় আনুগত্য ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক পদায়নের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এর আড়ালে কত কর্মকর্তা নিঃশব্দে বঞ্চনা, অপমান ও পেশাগত নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, সেসব গল্প খুব কমই সামনে আসে। কেউ বছরের পর বছর ওএসডি থেকেছেন, কেউ জুনিয়রের অধীনে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আবার অনেকেই বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন। এমন বঞ্চনার শিকার হয়েছেন অনেকেই। এদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের দুই কর্মকর্তা ‘ইসলাম’ ও ‘রহমান’-এর পদোন্নতি বঞ্চনার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত।
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ‘ইসলাম’। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই দক্ষ ও সংস্কৃতিমনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি সাহিত্য, প্রবন্ধ ও নাট্যরচনায়ও ছিল তার আগ্রহ। ঢাকায় সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন তিনি। পাবনার একটি উপজেলায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পান। তখন দেশে ১/১১-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাকে ‘জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কর্মকর্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রামের একটি দ্বীপ উপজেলায় ইউএনও হিসেবে পাঠানো হয়। সেখানে স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিভিন্ন অনৈতিক দাবি প্রত্যাখ্যান করায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই সময় তিনি জেলা প্রশাসকের প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে এলে তাকে প্রত্যাহার করে কিশোরগঞ্জের একটি পৌরসভায় পদায়ন করা হয়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কাছে এ ধরনের পদায়নকে ‘ডাম্পিং পোস্টিং’ হিসেবে দেখা হয়।
২০১২ সালের মার্চে তাকে আবারও ওএসডি করা হয়। প্রায় দুই বছর ওএসডি থাকলেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। একই সময়ে তার ব্যাচের কর্মকর্তারা উপসচিব পদে পদোন্নতি পেলেও তিনি বাদ পড়েন। চারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ার পর ২০১৬ সালে তাকে উপসচিব করা হয়। এরপরও দীর্ঘ সময় তাকে যুগ্ম সচিব করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, উপসচিব হিসেবেই তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয় এবং কখনও কখনও জুনিয়র কর্মকর্তাদের অধীনেও কাজ করতে হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ১২ বার পদোন্নতিবঞ্চিত হন। দীর্ঘ বঞ্চনার মধ্যেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান। বিভিন্ন ছদ্মনাম ও প্লাটফর্ম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রকাশ করতেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি গোপনে সম্পৃক্ত ছিলেন। লিফলেট লেখা, বিশ্লেষণধর্মী রাইট-আপ তৈরি, নির্বাচনপূর্ব জরিপ বিশ্লেষণÑ এসব কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে দৌড়ে রিকশায় উঠতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তার মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার করতে হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাকে পর্যায়ক্রমে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও গ্রেড-১ পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার আলোচনা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও বিরোধিতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অবশেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অবসরে যান।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার আগের দিন চেয়ারপারসনের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাকে (সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডেকে এই কর্মকর্তা সম্পর্কে জানতে চান। বলেন, ইসলাম একজন যোগ্য কর্মকর্তা। যেখানে তিনি পদায়ন পেতে চান সেইখানে অর্ডার করুন। তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেই অনুশাসন কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসন ক্যাডারের আরেক কর্মকর্তা ‘রহমান’। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ে কর্মরত অবস্থায় দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান। তবে ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ২০০৯ সালের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বৈরিতা শুরু হয়। ২০০৯ সালে তাকে অন্যত্র পদায়নের কথা বলে প্রায় এক বছর বেতন বন্ধ রাখা হয়। ২০১০ সালে তাকে ওএসডি করা হয়। দুই বছর পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এ অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। মামলাটি নিষ্পত্তি হতে সাত বছর সময় লাগে। এই পুরো সময় তার বেতন বন্ধ ছিল বলে জানা যায়।
বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও তার দুর্ভোগ কমেনি। ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। এ সময় তাকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। পরিবারও ছিল নজরদারির মধ্যে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হয়রানি থেকে বাঁচতে তাকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি পর্যন্ত করতে হয়েছে। চাকরির পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি অবসর নিতে বাধ্য হন।
সূত্রগুলো বলছে, ২০০১ সাল থেকেই তিনি বিভিন্ন নির্বাচনী বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালের পর সচিবালয়ের জাতীয়তাবাদী চিন্তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠিত করার কাজেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাকে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে ভূতাপেক্ষ সচিব পর্যায়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে সচিব পদমর্যাদায় একটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে পূর্ণ সচিব মর্যাদা না থাকায় তিনি যোগ দেননি বলে জানা যায়। সূত্র বলছে, গত দেড় দশকে অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে গেছেন। কেউ ওএসডি অবস্থায় মারা গেছেন, কারও পরিবার ভেঙে গেছে, কেউ দেশত্যাগ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে মেধাবী ও পেশাদার কর্মকর্তাদের একটি অংশ ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘যখন প্রশাসনে মেধা ও পেশাদারত্বের বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রধান মানদণ্ড হয়ে যায়, তখন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। শুধু মতাদর্শের সন্দেহে কাউকে বছরের পর বছর ওএসডি রাখা বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।’ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনর্মুল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন বঞ্চনার শিকার হয়েছেন কিন্তু এখনও শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম, তাদের রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিলেই হবে না; প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার। একই সঙ্গে অতীতে যারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন করাও জরুরি। ’
‘ইসলাম’ ও ‘রহমান’-এর ঘটনা শুধু দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রভাবেরও প্রতিচ্ছবি।