× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ট্যানারি বর্জ্যে মিলছে ডলার

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ০৯:২৭ এএম

ট্যানারির ফেলে দেওয়া কঠিন ও তরল বর্জ্য থেকে জেলাটিন ও প্রোটিন পাউডার তৈরি করে রাশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করে মিলছে বৈদেশিক মুদ্রা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ট্যানারির ফেলে দেওয়া কঠিন ও তরল বর্জ্য থেকে জেলাটিন ও প্রোটিন পাউডার তৈরি করে রাশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করে মিলছে বৈদেশিক মুদ্রা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ট্যানারির ফেলে দেওয়া কঠিন ও তরল বর্জ্য এখন আর ফেলনা নয়। এসব বর্জ্য রিসাইকেল করে তৈরি হচ্ছে জেলাটিন ও প্রোটিন পাউডার। বানানো হচ্ছে ক্যাপসুলের কভার, কসমেটিকসের কাঁচামাল ও ইট-টাইলসসহ বিভিন্ন অর্থকড়ি পণ্য।

বিশেষ করে জেলাটিন ও প্রোটিন পাউডার তৈরি করে রাশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করে মিলছে বৈদেশিক মুদ্রা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্যানারি বর্জ্যকে অবহেলা করে ফেলে না রেখে বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারলে দেশে বছরে দুই হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। এতে করে দেশীয় ওষুধ শিল্পেও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। 

চামড়া শিল্পকে লাভজনক ও পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় ট্যানারিগুলোকে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি ট্যানারি শিল্প নগরীতে গিয়ে দেখা যায়, যে প্রত্যাশা নিয়ে এই স্থানান্তর তা কাগজেই রয়েছে। রাস্তার আশপাশে পড়ে আছে চামড়ার পরিত্যক্ত অংশ যেমন কান, ঠ্যাং, মাথার চামড়া। এগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অথচ এসব অংশ এখন ফেলনা নয় বরং স্বর্ণের মতোই দামি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব চামড়ার কঠিন বর্জ্য (ক্রোম শেভিং ডাস্ট) থেকে জেলাটিন ও প্রোটিন পাউডার তৈরি করে রাশিয়া, চীন ও ভিয়েতনামে রপ্তানি শুরু করেছে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি চীনের ওয়েনঝু ইউয়েনফেই পিয়ংইয়ংয়ের মালিকানাধীন। 

জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, চামড়া নরম করতে শিল্প-প্রোটিন পাউডার ব্যবহার হয়। আর ওষুধের ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে জেলাটিন ব্যবহার হয়। 

ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের (সিইটিপি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ট্যানারি নগরীতে বছরে সলিড ওয়েস্ট উৎপন্ন হয় ৯০ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে কাঁচা চামড়ার টুকরা উৎপন্ন হয় ১৬ হাজার মেট্রিক টন। সেগুলো নিয়ে কাজ করতে ৬টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা রিসাইকেল করে ভিয়েতনাম, চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করবে। তাদের মধ্যে জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি কাঁচা চামড়ার টুকরা নিয়ে গ্লো জেলাটিন ও ক্যাপসুলের কভার তৈরি করছে। এতে ১৬ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা চামড়ার টুকরো পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী হয়েছে। আর ক্রোম সেভিং ডাস্ট উৎপন্ন হয় ৮ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। এটি টক্সিক। কোম্পানিটি ক্রোম সেভিং ডাস্ট নিয়েও কাজ করছে। তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোটিন পাউডার করে রাশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করবে। তারা বছরে ১৫ হাজার মেট্রিক টনের মতো নিতে পারবে। সেখানে আমাদের উৎপন্ন হয় ৮ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ পুরোটাই সেখানে চলে যাবে। এগুলো আগে অবৈধভাবে মুরগি ও মাছের খাবারের জন্য ব্যবহার করতে নিয়ে যাওয়া হতো। বর্তমানে এটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোটিন পাউডার হয়ে বিদেশে রপ্তানি হবে। এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি ৪ হাজার মেট্রিক টনের মতো নিয়েছে। ১৬ হাজার মেট্রিক টন সলিড ওয়েস্ট ও ৮ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ক্রোম সেভিং ডাস্টসহ ২৪ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্যের সমাধানের পথ বের করা গেছে। 

তিনি বলেন, ফ্লেসিং ওয়েস্ট উৎপন্ন হয় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। এগুলো দুটি পুকুরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এসব দিয়ে টেলো, ফার্টিলাইজার ও বায়োগ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। আর ইটিপি স্লাস ও সলিড ওয়েস্টের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে টাইলস তৈরি করা হয়েছে। এগুলো বাজারজাত করার চেষ্টা চলছে। বছরে ৪-৫ টন টাইলস তৈরি হতে পারে। 

গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, সলিড ওয়েস্ট সিইটিপিতে আসার কথা নয়। এটি ট্যানারিগুলোতেই রিসাইকেল হয়ে যাওয়ার কথা। ট্যানারিগুলো নিজেরা রিসাইকেল করতে পারলে বছরে দুই হাজার কোটি টাকা আয় হওয়া সম্ভব। এখন সলিড ওয়েস্ট কোনো ওয়েস্ট নয় বরং গোল্ড। 

তিনি বলেন, ট্যানারিগুলো হাজারীবাগে থাকাকালে পরিবেশদূষণ বেশি ছিল। এখন অনেকটাই কমে এসেছে। প্রতিটি ট্যানারিতে প্রি-ট্রিটমেন্টের কারণে ১৫-২০ শতাংশ শোধন হচ্ছে। তারপর ক্রোম সেপারেশন হয়ে সিইটিপিতে আসছে। সিইটিপির কিছু ডিজাইন ত্রুটির কারণে আমরা প্যারামিটার অর্জন করতে পারিনি। 

সাভারের মির্জানগরের টাকসুরে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড কোম্পানিতে সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, ট্যানারির কঠিন বর্জ্যগুলো কয়েকটি চুল্লিতে রাখা হয়েছে। এগুলো মূলত লবণযুক্ত চামড়ার অবশিষ্টাংশ। এসব বর্জ্যের চুলগুলো পরিষ্কার করার ফলে ধবধবে সাদা। এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তা পারভেজ খান বলেন, ক্রোম সেভিং ডাস্ট বা কঠিন বর্জ্যগুলো রিসাইকেল করে এ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে সাতটি ধাপ পার করে এগুলো রপ্তানিপণ্যের উপযোগী করা হয়। 

তিনি বলেন, ট্যানারি বর্জ্যের একটি প্রকার হচ্ছে ওয়েট ব্লু সেভিং ডাস্ট ও ওয়েট ব্লু ট্রিমিংস। আরেকটি কাঁচা চামড়া ট্রিমিংস, এটি মূলত লবণযুক্ত অংশ। অর্থাৎ কান, ঠ্যাংয়ের কাটা অংশ। আরেকটি হচ্ছে চর্বিযুক্ত তরল বর্জ্য। এটিকে বলা হয় ফ্রেসিং। এই ফ্রেসিং বাইরে এনে করা সম্ভব নয়। তবে ট্যানারির আশপাশে জমি পেলে সেখানে এটি প্রসেসিং করা যাবে। এগুলো সাবানের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। 

রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, আমরা ফেলে দেওয়া বর্জ্যগুলোকে রপ্তানিমুখী পণ্যে পরিণত করছি। এগুলো আগে পরিবেশদূষণ ঘটাত, তা থেকে পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে। তাই সরকার যদি রপ্তানি খাতে যে প্রণোদনা দেয় সেটি পেলে আমরা উপকৃত হব। চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ইতঃপূর্বে যারা এসব বর্জ্য পোল্ট্রি, মৎস্যসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করত তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক অসাধু লোক আমাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার চালাচ্ছে। নানা ধরনের হুমকি-ধমকি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের নিরাপত্তা সহযোগিতা দরকার। তা ছাড়া বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ দরকার। 

জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডের কর্ণধার লু চেং ফেং বলেন, আমরা রপ্তানির অনুমোদনে কারখানা স্থাপন করেছি। পণ্যগুলো আমরা পুরোটাই রপ্তানি করব। 

ট্যানারির বর্জ্য থেকে জিলাটিন ও সেটি দিয়ে ক্যাপসুলের কভার তৈরি করছে চীনের প্রতিষ্ঠান জাওফেং জেলাটিন লিমিটেড। ঢাকার সাভারে এ জন্য কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স পায়। 

এ ব্যাপারে জাওফেং জেলাটিন লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার কাউসার আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জিলাটিন কসমেটিকস, খাদ্য শিল্প এবং প্রধানত ক্যাপসুল সেল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আগে পাকিস্তান থেকে জিলাটিন আমদানি করা হতো, এখন আমরা নিজেরাই তা উৎপাদন করছি। তিনি বলেন, আমাদের প্রতি মেশিনে প্রতিদিন ২০ লাখ পিস ক্যাপসুল সেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। 

বাংলাদেশে প্রতি মাসে ক্যাপসুলের চাহিদা প্রায় ১০ কোটি পিস। স্কয়ার বা ইনসেপ্টার মতো বড় কোম্পানিগুলো ভারত বা চীন থেকে ক্যাপসুল কভার আমদানি করে থাকে। বর্তমানে দেশে তৈরি হওয়ায় অনেকগুলো ওষুধ কোম্পানি ক্যাপসুলের কভার কিনছে। তিনি বলেন, জাওফেং জিলাটিন এই চাহিদা পূরণ করায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। 

বাংলাদেশে টেকসই চামড়া খাত বিনির্মাণে ১ মার্চ ২০২৩ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। এতে যুক্ত রয়েছে জীবন ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর এএমএম খায়রুল আনাম বলেন, চামড়া শিল্পকে রপ্তানিমুখী করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে আমরা কাজ করায় এ সময়ে অনেক ধরনের ইতিবাচক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ট্যানারি বর্জ্যগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে আমাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা