নাসির-তামিমা মামলা
বোরহানউদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ০৯:০৮ এএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৬ ০৯:২২ এএম
বিয়েকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় আগামী ১০ জুন রায়ের অপেক্ষায় ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা। ছবি: তামিমা সুলতানা তাম্মির ফেসবুক থেকে
বিচ্ছেদের আগেই অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করার অভিযোগে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মির বিরুদ্ধে করা মামলাটি এখন রায়ের অপেক্ষায়।
এই মামলাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা।
আদালত যদি মনে করেন, তামিমার আগের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় নতুন করে বিয়ে হয়েছে, তাহলে কী ধরনের আইনি পরিণতি হতে পারে তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। কেউ কেউ বিয়েটাকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে থাকলেও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে মূল প্রশ্ন ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; বরং আইনগত বৈধতা। আগামী ১০ জুন মামলার রায়ের তারিখ ধার্য রয়েছে।
বাংলাদেশ দণ্ডিবিধির ৪৯৪ ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি তার স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় এবং বৈধভাবে আগের বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ না করেই আবার বিয়ে করলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আইনে এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৪৯৪ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আগের বিয়ে আইনগতভাবে বৈধ ছিল কি না। দ্বিতীয়ত, সেই বৈবাহিক সম্পর্ক নতুন বিয়ের সময় পর্যন্ত বহাল ছিল কি না। তৃতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তি আগের সম্পর্ক বহাল থাকার বিষয়টি জানতেন কি না। আদালত এসব বিষয় সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করবেন। আদালত যদি মনে করেন তামিমার আগের তালাক আইনগতভাবে কার্যকর হয়নি এবং সেই অবস্থাতেই নতুন বিয়ে হয়েছে, তাহলে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় শাস্তির বিষয়টি সামনে আসতে পারে। আদালত চাইলে মামলার পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিতে পারেন।
আইনজীবীদের মতে, মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাকের ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়। তালাকের নোটিস সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হয়। এরপর একটি নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তালাক কার্যকর হয়। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে আগের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল আছে বলেই ধরে নেওয়া হয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাসির-তামিমা মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে তালাক ও দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে অনেক সময় সামাজিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। ফলে পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি হয়।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ৬ মে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত আগামী ১০ জুন মামলার রায়ের দিন ঘোষণা করেন।
২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিয়ের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা তামিমার আগের স্বামী রাকিবের নজরে আসে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তিনি ওই মামলা দায়ের করেন।
তার অভিযোগ, বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থাতেই তামিমা ক্রিকেটার নাসিরকে বিয়ে করেন। বাদীপক্ষের দাবি, আইনগতভাবে তালাক কার্যকর হওয়ার আগেই নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা।
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে নোটিস পাঠানো, সালিশি বোর্ড গঠন এবং নির্দিষ্ট সময় অতিক্রমের মতো ধাপ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই নতুন করে বিয়ে করা হলে তা আইনগত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তবে নাসির ও তামিমার পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিয়ের আগেই আগের বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়েছিল এবং আইন অনুযায়ীই তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সময়ও একই বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
মামলাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জন-আগ্রহ। দেশের খ্যাতনামা একজন ক্রিকেটার মামলায় জড়িত থাকায় মামলাটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে আদালতপাড়াতেও এটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। অনেকে এই বিয়েকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলেও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে মূল প্রশ্ন ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; বরং আইনগত বৈধতা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যাচ্ছে বিয়ে ও তালাক শুধু সামাজিক বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেও পড়ে। নিয়ম না মেনে সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তীতে ফৌজদারি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। সব মিলিয়ে, নাসির-তামিমা মামলা এখন শুধু তারকাজগতের আলোচিত ঘটনা নয়, বরং পারিবারিক আইন ও দণ্ডবিধির বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।এখন সবার নজর আদালতের রায়ের দিকে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমার সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের আট বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। কিন্তু রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও নাসির বিয়ে করেন।