× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

থমকে আছে দুদক

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও তোফাজ্জল হোসেন কামাল

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ০৮:৩৭ এএম

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬ ০৮:৫০ এএম

নতুন কমিশন গঠন না হওয়ায় কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নতুন কমিশন গঠন না হওয়ায় কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানই এখন কার্যত নেতৃত্বহীন।

 ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে আড়াই মাস, এরপরও নতুন কমিশন গঠন হয়নি।

ফলে প্রতিদিন জমা পড়া শত শত অভিযোগ শুধু ফাইলবন্দি হয়ে থাকছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য পাঠানোর মতো বৈধ কর্তৃত্বও নেই কারও হাতে। 

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, প্রতিষ্ঠার ২১ বছরের ইতিহাসে এর আগে কখনও এমন অচলাবস্থার মুখে পড়েনি সংস্থাটি। কমিশন না থাকায় পুরো প্রশাসনিক কাঠামো যেন সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে গেছে। বাইরে থেকে নিয়মিত কার্যক্রম চলমান মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তদন্ত, অনুসন্ধান ও আইনগত সিদ্ধান্তের বড় অংশ স্থবির হয়ে আছে।

দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান-২) মো. মোতাহার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগের কমিশনের সময়ে যেসব অনুসন্ধান অনুমোদন পেয়েছে, সেগুলো সীমিত আকারে চলমান আছে। কিন্তু নতুন করে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। 

দুদক সূত্র বলছে, পূর্ণাঙ্গ কমিশন থাকার সময় প্রতিদিন গড়ে তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ত। এসব অভিযোগ প্রথমে চেয়ারম্যানের দপ্তরে যেত, পরে কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচাই-বাছাই সেলে পাঠানো হতো। যাচাই শেষে যেগুলো তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো, সেগুলো অনুসন্ধানের অনুমোদন পেত। কিন্তু গত আড়াই মাসে সেই পুরো প্রক্রিয়াই থেমে আছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ে অন্তত ২০ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু কোনটি অনুসন্ধানযোগ্য, কোনটি নয়Ñ সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি। 

দুদকের এক পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বর্তমান আইনে অভিযোগ যাচাই সেলে পাঠানোর ক্ষমতাও কার্যত কমিশনের হাতে। চেয়ারম্যান না থাকায় অভিযোগ শুধু জমা হচ্ছে, কিন্তু পরবর্তী ধাপে যাচ্ছে না।”

কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, আমলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান একাধিক অনুসন্ধানও এখন ধীরগতিতে চলছে। অনেক মামলার তদন্ত শেষ হলেও অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ফলে সেগুলো আদালতে জমা দেওয়া যাচ্ছে না।

এক কর্মকর্তা বলেন, “কমিশন না থাকায় মাঠপর্যায়ে কার্যত কোনো তদারকি নেই। নতুন অনুসন্ধান নেই, অভিযান নেই, জিজ্ঞাসাবাদের নোটিসও দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক কর্মকর্তা এখন পুরনো ফাইল গুছিয়ে সময় পার করছেন।”

কর্মকর্তাদের মতে, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের গতি কমে যাওয়ায় অভিযুক্তদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। 

বর্তমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধনী খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার না থাকলেও জরুরি প্রয়োজনে দুদকের সচিব মহাপরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যক্রম চালাতে পারবেন। পরে কমিশন গঠিত হলে সেই সিদ্ধান্ত কমিশনকে অবহিত করতে হবে। 

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমান আইনে সব ক্ষমতা কমিশনের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে পুরো কমিশন একসঙ্গে পদত্যাগ করলে প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি না হয়, সেজন্যই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

সংশোধনী খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং, বিদেশে অর্থ পাচার, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ, পুঁজিবাজার জালিয়াতি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও জালিয়াতিকেও দুদকের এখতিয়ারভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিতর্কিত ৩২(ক) ধারা বাতিলের প্রস্তাবও এসেছে। এই ধারায় সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। উচ্চ আদালত আগেই ধারাটি অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। এ ছাড়া তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা শিথিল, গোপন অনুসন্ধান পরিচালনা, কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিদেশি নাগরিকত্বধারীদের কমিশনার পদে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাবও রয়েছে সংশোধনীতে।

সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৫ সালে একটি সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। সেখানে কমিশনার নিয়োগে সাত সদস্যের বাছাই কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়। কমিটিতে বিচারপতি, সিএজি, পিএসসি চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি নারী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কমিশনার অন্তর্ভুক্তির কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল করা হয়। ফলে আগের পদ্ধতিতে কমিশন নিয়োগের বিষয়টি বহাল থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কাঠামো নাকি পুরনো পদ্ধতিÑ এই দ্বন্দ্বের কারণেই কমিশন নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দুদকে একাধিকবার নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করে। এর আগেও সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমিশনকে বিদায় নিতে হয়েছে।

দুদকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি দুদকের নেতৃত্বও বদলে যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “দুদকের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আড়াই মাস কমিশন না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে শুধু প্রশাসনিক স্থবিরতাই তৈরি হয় না, দুর্নীতিবিরোধী বার্তাও দুর্বল হয়ে পড়ে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান আইনের বড় দুর্বলতা হলোÑ সব সিদ্ধান্ত কমিশনের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে পুরো কমিশন একসঙ্গে সরে গেলে প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে।”

তার মতে, “দুদকের স্বাধীনতা শুধু আইনে লিখে দিলেই হয় না। বাস্তবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কমিশন পরিবর্তনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।”

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, দুদকের কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠনের কাজ শিগগির শুরু হতে পারে। এই মুহূর্তে সার্চ কমিটি করা হলে দুদকের আগের আইনেই কমিশন গঠন করা হবে। দুদক আইন সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটিতে থাকবেনÑ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্যবিদায়ী সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটি একাধিক সভা করে দুদকের নতুন তিন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ছয় ব্যক্তির নাম পাঠাবে। পরে রাষ্ট্রপতি ওই ছয়জনের মধ্য থেকে তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এই তিনজনের মধ্যে একজন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাবেন।

সূত্র জানায়, গত ২৩ ডিসেম্বর দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। ওইদিনই দুদক সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি এবং বাকি ১৩টির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আইন অনুযায়ী, ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের ৩০ দিন পর অর্থাৎ ১১ এপ্রিল থেকে ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়। এরপর থেকেই দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল রয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা