× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাম

মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১১:৪১ এএম

চাঁদপুর থেকে শুক্রবার হাম আক্রান্ত দুই সন্তান শেখ সাদি ও সালমানকে ঢাকায় নিয়ে আসেন মা-বাবা। শুক্রবার মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চাঁদপুর থেকে শুক্রবার হাম আক্রান্ত দুই সন্তান শেখ সাদি ও সালমানকে ঢাকায় নিয়ে আসেন মা-বাবা। শুক্রবার মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্রতিদিনই হাম আক্রান্তের পাশাপাশি দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। সন্তান হারানো পিতা-মাতার শোক আর কান্নায় ভারী হচ্ছে প্রকৃতি। এ অবস্থায় শিশু আছে এমন প্রতিটি পরিবারের এখন দিন কাটছে আতঙ্কে। সামান্য সর্দি-জ্বর হলেই হতবিহ্বল হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা। আতঙ্কিত হওয়া কারণও যথেষ্ট : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টার (গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) তথ্য মতে, চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু! মাত্র দুই মাসে সরকারি হিসাবেই এত মৃত্যু, প্রশ্ন উঠেছেÑ কেন এত মৃত্যু? এ মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে?

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা হামের টিকা না পাওয়া বা টিকাদানে ঘাটতি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল না পাওয়া এবং শিশুদের অপুষ্টির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা আরও বলছেন, হামের এ প্রাদুর্ভাব এখন আর কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ ও জবাবদিহির একটি কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে, এই সংকট আকস্মিক নয়, বরং এটি ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিলম্বিত পদক্ষেপের ফল। যার বলি হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। তবে আইসোলেশন নিশ্চিত করা, ভিটামিন ‘এ’ ও অক্সিজেন সেবা সহজলভ্য করা এবং আইসিইউর জন্য বেসরকারি খাতের সহায়তা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে হামে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে হাসপাতালের বাইরেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জ্বর হওয়ামাত্রই আইসোলেশনে নিয়ে আসতে হবে; এর কোনো বিকল্প নেই। সেখানে তাদের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে রোগী ক্রিটিক্যাল বা সংকটাপন্ন হবে না। এই কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো, সাধারণ খাবার দেওয়া এবং নিয়মিত তাপমাত্রা ও রক্তচাপ মাপার মাধ্যমে ৯০ শতাংশ শিশুকে সুস্থ করা সম্ভব।

হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কমাতে ‘প্রি-হসপিটাল’ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব কথা তুলে ধরে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শিশুদের অবস্থা গুরুতর হওয়ার আগেই তাদের অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আইসিডিডিআরবি (icddrb) কম খরচে অক্সিজেন বিতরণের কাজ করছে, যা সরকার কাজে লাগাতে পারে, বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ এবং এনআইসিইউগুলোকে (NICU) সরকার অধিগ্রহণ করতে পারে অথবা সেখানে সরকারি খরচে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারে। এতে বিশেষজ্ঞরা শিশুদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

২০ মে থেকে ব্যাপক টিকাদানের ফলাফল পাওয়া শুরু হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে মনে রাখতে হবে, টিকা ক্যাম্পেইন ভবিষ্যৎ সংক্রমণ কমাবে, কিন্তু যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে গেছে তাদের মৃত্যু ঠেকাতে আইসোলেশন ও উন্নত চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। কেননা, হামের সংক্রমণ ছড়ানোর একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে। হামের র‍্যাশ দেখা দেওয়ার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত এটি তীব্রভাবে ছড়ায়। তাই আক্রান্ত শিশুকে প্রায় ৯ দিন হাসপাতালে বা আইসোলেশনে রাখা জরুরি, যাতে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, কোনো মহামারি দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না। কিন্তু মহামারি মোকাবিলায় কাজ করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়।

হামের এ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, হাম প্রতিরোধে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ নয়, বরং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান, মেম্বার), স্বেচ্ছাসেবী এবং এনজিওদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এ ছাড়া সরকারকে দ্রুত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহযোগিতায় উন্নত ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা চিকিৎসকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে চার শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ৮ শিশুর। এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৯২ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে; এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১ হাজার ১৬ জনকে। হাম শনাক্ত হয়েছে ১১১ শিশুর শরীরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিশ্চিত হামে মারা যাওয়া চার শিশুর দুজন ঢাকা বিভাগের আর একজন করে রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে। হামের উপসর্গ নিয়ে মাারা যাওয়া আট শিশুর তিনজন ঢাকা বিভাগের, তিনজন চট্টগ্রাম বিভাগের আর একজন করে রয়েছে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০ হাজার ১৭৬ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৬ হাজার ৫৫ শিশু। আর গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্তর সংখ্যা ৭ হাজার ৪১৬ জন।

এদিকে গতকাল শুক্রবার, হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হামে আক্রান্ত শতকরা ৯৯ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রজনিত জটিলতা দেখা দিলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা এসব তথ্য তুলে ধরেন। এ সময় লিখিত বক্তব্যে এভারকেয়ার হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক বলেন, অতীতে সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে হাম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে গেলেও গত দুই বছরে টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় সংক্রমণ আবার বেড়েছে। তিনি বলেন, হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শ্বাসতন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া। এ সময় হামের বিস্তার রোধে চারটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সেগুলো হলোÑ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা, উপজেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ‘ফিভার কর্নার’ চালু করে হামপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত চিকিৎসা নির্দেশিকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

এদিকে গতকাল জুমার পর হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত শিশুদের স্মরণে রাজধানীর শাহবাগে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’-এর ব্যানারে কয়েকজন এ গায়েবানা জানাজা পড়েন। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা