ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকা কারবারি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। প্রতীকী ছবি
প্রতি বছরই ঈদ, পূজা-পার্বণের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে জাল টাকা কারবারি চক্রের সদস্যরা। ধরা পড়াদের মধ্যে অধিকাংশই প্রিন্টিং ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত। আসন্ন ঈদুল আজহা ঘিরে রাজধানী থেকে সীমান্তঘেঁষা জেলা সবখানেই নগদ টাকার লেনদেন বাড়ছে। এই সুযোগে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকা কারবারি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মাঠে নেমেছে ‘নোট মাফিয়া’। তাদের টার্গেট পশুর হাট, কোরবানির চামড়ার বাজার, শপিংমল, বাস টার্মিনাল ও ঈদকেন্দ্রিক নগদ লেনদেন। কেনাকাটার ভিড় ও গ্রাহকদের অসতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে আসল নোটের সঙ্গে জাল টাকা মিশিয়ে দেওয়া হয়। এখনকার জাল নোট আগের তুলনায় এতটাই নিখুঁত যে, সাধারণ শনাক্তকারী মেশিনেও ধরা পড়ছে না।
গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা সংঘবদ্ধ চক্রগুলো ঈদকে সামনে রেখে কোটি কোটি টাকার জাল টাকা বাজারে ছাড়ার চেষ্টা করছে। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের কিছু আবাসিক ভবন, গ্যারেজ ও গোপন বাসা ব্যবহার করা হচ্ছে অস্থায়ী ছাপাখানা হিসেবে। এসব জায়গায় রাতভর চলছে জাল টাকা ছাপানোর কাজ।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চক্রগুলো এখন আর সাদামাটা স্ক্যানার বা ফটোকপি-নির্ভর নয়। বৈধ ব্যবসার আড়ালে তারা উন্নতমানের প্রিন্টার, স্ক্যানার, কাটিং ডিভাইস ও বিশেষ প্রিন্টিং যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করছে। গ্রাফিক্স, স্টিকার, ডিজাইন কিংবা ফটোকপির ব্যবসার নামে এসব মেশিন কেনা হলেও কিছু যন্ত্রাংশ ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে চোরাইভাবে আনার তথ্যও পেয়েছেন গোয়েন্দারা। জাল নোট তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ কাগজ, নিরাপত্তা সুতাসদৃশ উপকরণ, হলোগ্রাম, রঙ পরিবর্তনকারী কালি ও ইউভি কেমিক্যাল অনলাইন মার্কেট ও পাইকারি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের দাবি, চক্রের সদস্যরা এখন আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসল নোট স্ক্যান ও ডিজাইন এডিট করছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব সরঞ্জামের বড় অংশ বৈধ ব্যবসাতেও ব্যবহৃত হয়। সাধারণ ব্যবসার আড়ালে বছরের পর বছর গোপনে জাল নোট তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে চক্রের সদস্যরা।
ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চক্রের সদস্যরা কয়েক স্তরে ভাগ হয়ে কাজ করছে। একদল ডিজাইন ও প্রিন্টিং করে, আরেক দল পরিবহন, আরেক দল বাজারজাতকরণে যুক্ত। সামাজিক মাধ্যমে গোপন গ্রুপ খুলেও ক্রেতা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আবার আন্তঃজেলা কুরিয়ার, বাস সার্ভিস ও পণ্যবাহী যান ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলায় জাল টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ৩৬ লাখ টাকার জাল নোটসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা মূলত মাঠপর্যায়ের অপারেটর। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও বড় নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে। তবে নেপথ্যে থাকা মাফিয়ারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গোয়েন্দারা বলছে, এবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে পশুর হাট। কারণ সেখানে রাতভর নগদ লেনদেন হয়, থাকে অতিরিক্ত ভিড়, আর দ্রুত টাকা গুনে লেনদেন শেষ করতে গিয়ে অনেকেই যাচাইয়ের সুযোগ পান না। এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে জাল নোট চক্রের সদস্যরা।
সূত্র জানায়, ক্রেতা সেজে হাটে প্রবেশ করে জাল নোট চক্রের সদস্যরা। মোটা অঙ্কের জাল নোট ধরিয়ে দিয়ে মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় তারা। কেউ কেউ আবার ছোটখাটো কেনাকাটার মাধ্যমে আসল টাকাও ভাঙিয়ে নেয়। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে, যখন ক্লান্তি ও ভিড়ে বিক্রেতারা দ্রুত লেনদেন শেষ করতে চান, তখনই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে এসব প্রতারক।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি প্রধান) শফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদ সামনে রেখে জাল টাকা চক্র সক্রিয় হওয়ার তথ্য আমরা পেয়েছি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। এখনকার জাল নোট আগের তুলনায় অনেক বেশি হাই কোয়ালিটির। জাল নোট চক্রের সদস্যদের ধরতে আমরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘জাল টাকা শুধু প্রতারণা নয়, এটি অর্থনীতির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধ। এর সঙ্গে মাদক, চোরাচালান ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ চক্রেরও সংযোগ থাকে। ঈদকে কেন্দ্র করে যারা বাজারে জাল নোট ছাড়ে, তারা মূলত সাধারণ মানুষের কষ্টের অর্থ ছিনিয়ে নেয়।’