× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিনিয়োগ বাণিজ্য চলছে পদোন্নতি-পদায়নে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ০৮:১৩ এএম

সচিবালয়ের করিডোর থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত এখন আলোচনায় ‘পদ বাণিজ্য’, ‘প্রভাব বাণিজ্য’ ও ‘বিনিয়োগের বিপরীতে পদ’ সংস্কৃতি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সচিবালয়ের করিডোর থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত এখন আলোচনায় ‘পদ বাণিজ্য’, ‘প্রভাব বাণিজ্য’ ও ‘বিনিয়োগের বিপরীতে পদ’ সংস্কৃতি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে আবারও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে পুরনো একটি ভয়ংকর অভিযোগ। পদোন্নতি ও পদায়ন ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শক্তিশালী দালাল ও তদবির চক্র। সচিবালয়ের করিডোর থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত এখন আলোচনায় ‘পদ বাণিজ্য’, ‘প্রভাব বাণিজ্য’ ও ‘বিনিয়োগের বিপরীতে পদ’ সংস্কৃতি।

প্রশাসনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, সাবেক আমলা ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ বা পদায়নের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে। কোথাও সরাসরি অর্থ দাবি, কোথাও আবার ‘বিনিয়োগকারী’ যুক্ত করে ভবিষ্যৎ সুবিধা আদায়ের শর্তÑ সব মিলিয়ে প্রশাসনের ভেতরে তৈরি হয়েছে নীরব অস্বস্তি।

প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে একাধিক সূত্র বলছে, অতীতে রাজনৈতিক তদবির বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর অভিযোগ থাকলেও এখনকার পরিস্থিতি বেশি জটিল। সাম্প্রতিক সময়ে একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক প্রশাসনিক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে সমান্তরাল প্রভাববলয় তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা নিজেদের ‘উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ’, ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ কিংবা ‘সমন্বয়কারী’ পরিচয় দিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সচিব, দপ্তরপ্রধান, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) পদে নিয়োগ বা পদায়নের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও দর হাঁকা হচ্ছে ২০ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। 

তথ্যমতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অর্থকে সরাসরি ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলা হচ্ছে, নিয়োগ বা পদায়নের পর বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা, প্রকল্প বণ্টন, টেন্ডার, বদলি কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ওই বিনিয়োগকারীদের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এজন্য আগাম সমঝোতা বা অলিখিত চুক্তির কথাও বলা হচ্ছে। প্রশাসনের একাধিক অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও কেউই প্রকাশ্যে নাম বলতে রাজি হননি। 

জনপ্রশাসনে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ‘পিডিএস’ বা পারসোনাল ডাটা শিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে কর্মকর্তার চাকরিজীবনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য, দক্ষতা, শৃঙ্খলা, গোপনীয় প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক মূল্যায়ন থাকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পিডিএস সংগ্রহ করেই তৎপর হচ্ছে চক্রগুলো।

সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের কক্ষে অচেনা কিছু ব্যক্তির আনাগোনা বেড়েছে। তারা নিজেদের ‘সমন্বয়কারী’ ‘উচ্চ পর্যায়ের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা’ কিংবা ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। পরে তারা গোপনে বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে পছন্দের পদায়ন বা পদোন্নতির নিশ্চয়তার কথা বলছেন।

একজন অতিরিক্ত সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “কিছু ব্যক্তি সরাসরি এসে বলেন, আপনার ফাইল ওপরে ভালো অবস্থানে আছে, চাইলে সচিব পদ নিশ্চিত করা যাবে। কেউ কেউ আবার নির্দিষ্ট অঙ্কের কথাও বলেন।”

তিনি আরও বলেন, “তারা অনেক সময় এমন কিছু তথ্য জানান, যা সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। এতে বোঝা যায়, প্রশাসনের ভেতর থেকেও কেউ না কেউ সহযোগিতা করছেন।”

মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি)। এ দুই পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও জেলা অনুযায়ী আলাদা ‘রেট’ নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা, সীমান্ত এলাকা, শিল্পাঞ্চল কিংবা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল জেলার জন্য বেশি অর্থ দাবি করা হচ্ছে। কোনো কোনো জেলার জন্য ১৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “যেসব জেলায় বড় উন্নয়ন প্রকল্প আছে, ভূমি অধিগ্রহণ হয়, শিল্প-কারখানা বেশি বা রাজনৈতিক প্রভাব বেশিÑ সেসব জেলার চাহিদাও বেশি।”

পুলিশ প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, কিছু ক্ষেত্রে এসপি পদে পদায়নের জন্য ব্যবসায়ী গোষ্ঠীও আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়া ও আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করা। 

সূত্র বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন করে দেখা হলেও প্রশাসনের ভেতরের কর্মকর্তারা বলছেন, এর শিকড় আরও আগের। আগের সরকারগুলোর সময়েও কমবেশি দালালদের প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যেত বলে অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এমনটা ঘটেছে উল্লেখ করে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “তখন বলা হতো অমুক উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ আছে, চাইলে সচিব পদোন্নতি দেওয়া যাবে। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার আসার পর নতুন কিছু মুখ আগের মতো সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু পদ্ধতি একই।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি বা দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের ভেতরের অনেকে মনে করছেন, এখনই কঠোর অবস্থান না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রীয় নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হলে তা শুধু সরকারের ভাবমূর্তিই নয়, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আস্থাকেও দুর্বল করবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রের সদস্যরা কখনও কখনও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ‘চূড়ান্ত বৈঠক’ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দিচ্ছেন। 

একজন যুগ্ম সচিব বলেন, “তারা বলেন, ওপরের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। শুধু শেষ পর্যায়ের সম্মতি দরকার।’ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অনেকে আবার সরাসরি অর্থ দিতে রাজি না হলেও ‘বিনিয়োগকারী’ খুঁজে দেওয়ার প্রস্তাব পাচ্ছেন। পরে নিয়োগ পেলে ওই বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দিতে হবেÑ এমন শর্তও দেওয়া হচ্ছে।”

এই পরিস্থিতি প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। মেধা, দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার বদলে অর্থ ও তদবিরকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছেÑ এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, “যারা সৎভাবে কাজ করছেন, তাদের অনেকেই হতাশ হচ্ছেন। কারণ চারদিকে যদি এই বার্তা যায় যে, টাকা ছাড়া পদোন্নতি হয় না, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হবে।”

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক এ ধরনের পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক উল্লেখ করে বলেন, “যদি প্রশাসনের নিয়োগ ও পদোন্নতি বাজারে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা ধ্বংস হবে। তখন কর্মকর্তারা জনগণের সেবক না হয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষক হয়ে উঠবেন। এ ধরনের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন বা উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রয়োজন।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের পদোন্নতি বা পদায়ন বাণিজ্যকে প্রশ্রয় দেয় না। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করা হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, “বিভিন্ন সময়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার চেষ্টা করেন। কর্মকর্তাদের এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।”

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রকাশ, মূল্যায়ন পদ্ধতি উন্মুক্ত করা এবং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব কমানো জরুরি। তাদের মতে, প্রশাসনে যদি ‘বিনিয়োগের সংস্কৃতি’ ঢুকে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। 

প্রশাসনের ভেতরের অনেকে মনে করছেন, এখনই কঠোর অবস্থান না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রীয় নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হলে তা শুধু সরকারের ভাবমূর্তিই নয়; পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আস্থাকেও দুর্বল করে। 

বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছেÑ অভিযোগের এই জাল কি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ফল নাকি সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনার আড়ালে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন এক অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্র?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা