হাট ইজারা
কিশোরগঞ্জের নিকলীর জারুইতলা-আটারবাড়িয়া গুপি রায়ের হাটে চলছে গরু বেচাকেনা। ফাইল ছবি
দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ গরুর হাট কিশোরগঞ্জের হাওরের নিকলী উপজেলার জারুইতলা-আটারবাড়িয়া গুপি রায়ের হাট এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
প্রতি বুধবার বসা এই হাটে হাজার হাজার গরু, মহিষ ও ছাগল কেনাবেচা হয়। ভাটি অঞ্চলের কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের কাছে এটি দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু এবার বাংলা ১৪৩৩ সালের জন্য হাটটির ইজারা মূল্য নির্ধারণ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর অস্বাভাবিক কম মূল্যে হাটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সরকারের ২ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলা ১৪৩২ সালে হাটটি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেন জমশেদ আলী। তখন ইজারা মূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে চলতি বাংলা সনে একই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। ইজারা নিয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মোকাররম হোসেন সর্দার। এই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের রাজস্ব কমেছে আড়াই কোটি টাকা।
হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বাজারটির প্রকৃত সম্ভাব্য আয় গোপন করে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় কম মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সমর্থন এবং বিভিন্ন মহলের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের কারণেই এমন কম দর সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই হাটে প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ পশু ওঠে, তাতে দেড় কোটি টাকায় ইজারা হওয়া অবিশ্বাস্য। আরেক খামারি বলেন, সরকার বদল হলেও সিন্ডিকেট বদলায়নি।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকলে এমন বিশাল পার্থক্য হওয়ার কথা নয়। দরপত্র আহ্বান, প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কতটা সুষ্ঠু ছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু গণমাধ্যমকর্মীও প্রভাবশালী মহলের সুবিধাভোগী হওয়ায় বিষয়টি যথাযথভাবে সামনে আসেনি।
কিশোরগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য মো. ফিরোজ উদ্দীন ভূঞা জানান, সরকারের এত বড় রাজস্ব ক্ষতি কেন হলো, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তা ছাড়া দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক ইজারা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। কারণ এ ধরনের রাজস্ব লোকসান সিন্ডিকেট ছাড়া সম্ভব না।
স্থানীয় অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বড় পশুর হাট শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এখানে সরকারের রাজস্ব কমে গেলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়ে। তাই বাজার ইজারায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে ১৪৩২ সালের ইজারাদার মো. জমশেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রায় ৪ কোটি টাকায় ডাকের পর তার লাভ হয়েছে। এবার কেন ডাকেননি?Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশাসন নানা জঠিলতা সৃষ্টিসহ অনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। তাই অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলছি।
বর্তমান ইজারাদার মোকাররম হোসেন সর্দার জানান, সর্বোচ্চ ডাকদাতা হিসেবে বাজার ইজারা পেয়েছি। এ ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. রেহেনা মজুমদার মুক্তি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দরপত্র আহ্বান করার পর ১ কোটি ২৫ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মোকাররম সর্দারের নাম আসায় আমরা তাকে ১৪৩৩ সালের জন্য বাজারটি ইজারা দিয়ে দিই। গত বছরের দর অনেক বেশি ছিল। এর জবাবে তিনি বলেন, এর আগের বছর আরও কম ছিল।