মৌলভীবাজারের বড়লেখা সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তারকৃত সাবেক সেনা সদস্য রাহেদ হোসেন মাহেদ (মাঝে হেলমেট পরিহিত)। ছবি: সংগৃহীত
নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী (জঙ্গি) সংগঠনের সদস্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদকে ভারতে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার ভোর রাতে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সীমান্ত পথে পালানোর সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাহেদের বাড়ি সিলেটে।
মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রিয়াজুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বুধবার ভোর রাতে সাবেক সেনা সদস্য মাহেদকে বড়লেখা সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় মামলা রয়েছে। তিনি জানান, ঢাকার যে থানায় মামলা রয়েছে, মাহেদকে সেই থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য মাহেদের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী আবু বক্কর আবু মোহাম্মদের সঙ্গে চাকরিচ্যুত সেনা সদস্য মাহেদের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
এ অবস্থায় গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো একটি চিঠিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা করে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করে পুলিশ সদর দপ্তর। দুই পৃষ্ঠার চিঠির উপরিভাগে ‘গোপনীয়’ লেখা থাকলেও এটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
চিঠির প্রথম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী আবু বক্কর আবু মোহাম্মদের সাথে চাকরিচ্যুত দুজন সেনা সদস্যের (কপি সংযুক্ত) নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে (জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ/সেনাবাহিনীর সদস্য অথবা স্থাপনাসমূহ, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্রসমূহ, শাহবাগ চত্বর প্রভৃতিতে) বোমা বিস্ফোরণ এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে মর্মেও জানা যায়। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকতে পারে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমতাবস্থায় বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের নিরাপত্তা জোরদারকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এ ছাড়াও নজরদারি বৃদ্ধিসহ বর্ণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও অনুরোধ করা হলো।’
পরের পৃষ্ঠায় ‘হামলা পরিকল্পনাকারী ব্যক্তিদের নাম এবং পরিচয়’ হিসেবে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন ছিলেন, মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ এবং অন্যজন মো. রাকিব হাসান। এদের বিভিন্ন ছদ্মনাম রয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে মাহেদ সেনা সদস্য; যার বাড়ি সিলেটে। রাকিব সেনা সদস্য নন। তার বাড়ি ঢাকার ধামরাই এলাকায়। এদের মধ্যে মাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে রাকিবকে ঢাকার ধামরাই থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের আলোচ্য চিঠি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের আগে থেকে অনলাইন স্পেস মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে মাহেদের ফেসবুক প্রোফাইলটি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে অনুসরণ করা হতো। এতে তার বিভিন্ন সময়ের বেশকিছু পোস্টের স্ক্রিনশট সংগ্রহ করেছে পুলিশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
এসব পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাবেক এই সেনা সদস্য নিয়মিত উগ্রপন্থী বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট শেয়ার দিতেন। সিলেটকেন্দ্রিক অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করার পাশাপাশি নিয়মিত উগ্রপন্থী লেখালেখি করতেন। এমনকি ভিন্ন চিন্তার ব্যক্তিদের হত্যার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে পোস্ট দিতেন তিনি। আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল আওলাকির ছবিও পোস্ট করতেন তিনি।
২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ফেসবুকে লেখেন, “সেনাবাহিনী দলগত মুরতাদ। প্রথমত এর কারণে বারাত। দ্বিতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা জালেম। তৃতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা আওয়ামী দোসর।”
সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। সুতরাং যে জমিনে আল্লাহর সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাফরমানি করতে হয়, শিরক করতে হয়, তাগুতের কাছে বিচার চাইতে হয়, সে জমিন হয় ফিতনামুক্ত করার চেষ্টা করো তলোয়ার দ্বারা, অথবা সে জমিন ত্যাগ করো।”
৫ সেপ্টেম্বর এক পোস্টে তিনি লেখেন, “মাজারপূজারি, মিলাদুন্নবী পালনকারীরা মুশরিক, বেদাতি। এদেরকে হত্যা করা বৈধ, রক্ত সর্বাবস্থায় হালাল। সুতরাং হে মুমিনরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।”
জুলাইয়ের ১৬ তারিখে এক পোস্টে তিনি বলেন, “তারা জঙ্গি বলে আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ফেলতে চায়। জানিয়ে দাও, এটাই আমাদের পরিচয়। আমি কে, তুমি কে— জঙ্গি, জঙ্গি।”
২০২৫-এর ১৫ আগস্ট মাহেদের একটি পোস্ট ভাইরাল হয় ফেসবুকে। সেটিতে লিখেছিলেন, “১৫ আগস্ট সারা দিন...বঙ্গবল্ডুকে তাকফির করার দিন...। পুরো শেখ পরিবার কাফের শুধু নাবালক বাচ্চারা ছাড়া, শেখের অনুসারীরা কাফের, তার দলের নেতারা কাফের, কর্মীরা কাফের। তাদেরকে মুসলমান মনে করা শায়েখরাও কাফের।”