সচিবালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনেরে বাংলাদেশ
গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রে সংস্কার ঘটবে, প্রশাসনে আসবে গতিশীলতা।
বিশেষ করে বছরের পর বছর সমালোচিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংস্কৃতি কমবেÑ পদোন্নতি-পদায়ন প্রত্যাশী মেধাবী কর্মকর্তারা এমনই আশা করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল হয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকারের সময়েও পুরনো সেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশাসনের ভেতরে বাড়ছে হতাশা, অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, বর্তমানে ৮৫ জন সচিবের মধ্যে অন্তত ২৫ জনই চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে প্রশাসনে অলিখিত রীতি ছিল যে, মোট সচিব পদের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাবে; অথচ এখন তা পৌঁছেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি শুধু পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারাকেই ব্যাহত করছে না, বরং কর্মপরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এক দশক অবসর কাটিয়ে আবারও সচিবালয়ে!
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক সিনিয়র সচিবের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ছিলেন। কাউকে কাউকে অবসর নেওয়ার প্রায় এক দশক পর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যেমন, বিসিএস প্রশাসন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. নাসিমুল গণি ২০০৯ সালে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হন। পরে অবসরে যান ২০১৬ সালে। দীর্ঘ সময় প্রশাসনের বাইরে থাকা এই কর্মকর্তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথমে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার আগ মুহূর্তে তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব করা হয়। প্রশাসনিক ইতিহাসের এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তিতে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও বহাল রাখে। তার ওপর রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করেও কয়েকজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিবের দায়িত্বে থাকা সাবেক আমলা এবিএম আব্দুস সাত্তারকে মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে আলোচনা তৈরি হয়। বিসিএস ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদও অবসরে গিয়েছিলেন এক দশক আগে; কিন্তু গত ২ মার্চ তাকে যুগ্ম সচিব থেকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
এসব ব্যাপারে একাধিক কর্মকর্তা জানান, “সরকার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু প্রশাসনের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় এ ধরনের নিয়োগ দিলে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ওঠাই স্বাভাবিক। এমন সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
‘একজনের চুক্তিতে বন্ধ হয় চারজনের পদোন্নতি’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, একজন সচিবকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে অন্তত তিন থেকে চারজন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়নের স্বাভাবিক ধারা আটকে যায়। কারণ সচিব পদে পদোন্নতি না হলে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পর্যায়েও শূন্যপদ তৈরি হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদোন্নতিপ্রত্যাশী একাধিক অতিরিক্ত সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রশাসনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে হতাশা আর অনিশ্চয়তা। তারা জানেন না মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতি হবে, নাকি হঠাৎ বাইরে থেকে কাউকে এনে বসানো হবে।”
তারা বলেন, “চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বিশেষ পরিস্থিতিতে হতেই পারে। কিন্তু এখন এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। এতে শুধু আমরা নই, তরুণ কর্মকর্তারাও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
প্রশাসনে ‘দ্বৈত কাঠামো’ তৈরি হচ্ছে
প্রশাসনের ভেতরে এখন কার্যত দুই ধরনের কাঠামো তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। একদিকে নিয়মিত কর্মকর্তারা, অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা বাড়ছে। একাধিক যুগ্ম সচিব বলেন, “বর্তমান প্রশাসন আগের তুলনায় অনেক বেশি ডিজিটাল, দ্রুত ও সমন্বয়নির্ভর। কিন্তু অনেক চুক্তিভিত্তিক সচিবই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক এই প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের অনেক সিদ্ধান্তই বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিতে হচ্ছে নতুন করে আরেকজনের কাঁধে। এতে প্রশাসনিক গতি কমে যাচ্ছে।”
একাধিক সূত্র জানায়, কিছু মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নীতিগত সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারাই কার্যত মূল ভূমিকা রাখছেন। অথচ আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যাচ্ছে চুক্তিভিত্তিক সচিবদের মাধ্যমে। এতে একদিকে তারা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। অন্যদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে।
তিন সচিব প্রত্যাহারের ঘটনায় প্রশ্ন
গত ২৫ মার্চ অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন তিন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের সচিবকে হঠাৎ প্রত্যাহারের ঘটনা প্রশাসনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ সময় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং আইএমইডি সচিব শিরাজুন নূর চৌধুরীকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তাদের স্থলে একজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং দুইজনকে পদোন্নতি দিয়ে পদায়নের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আপত্তি জানালে সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়ে যায় এবং আগের কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল করা হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে প্রশ্ন উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসলে কোথা থেকে হচ্ছে? নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “একজন সচিবকে অন্যত্র সরানো বা নিয়োগ দেওয়া শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়Ñ এটি নীতিগত ও রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। সেখানে যদি সমন্বয় না থাকে, তাহলে পুরো প্রশাসনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।”
‘চুক্তির সংস্কৃতি’ কেন বাড়ছে
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তনের পর নিজেদের নীতিনির্ধারণী অবস্থান শক্ত করতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার প্রবণতা দেখা যায়। তবে তাদের মতে, “এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের পেশাদারত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রশাসনে যদি নিয়মিত পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা ভেঙে যায়, তাহলে মেধাবী কর্মকর্তাদের মধ্যে নিরুৎসাহ দেখা দেব।”
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, “বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাউকে চুক্তিতে আনা যেতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হবে সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক। সচিব পদের মতো জায়গায় অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের স্বাভাবিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অন্য কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ও আস্থার সংকট তৈরি হয়।”
সাবেক এই আমলার মতে, “প্রশাসনের দক্ষতা বাড়াতে হলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই যোগ্য ও পেশাদার নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।”
নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও প্রভাব
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনের গতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশাসনের ভেতরে যদি অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ বাড়তে থাকে, তাহলে সেটির প্রভাব মাঠপর্যায়ের কাজেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে মাঠপ্রশাসনে কর্মরত একজন শীর্ষ কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) নাম প্রকাশ না করে বলেন, “প্রশাসন শুধু আদেশে চলে না; এটি মনোবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে। কর্মকর্তারা যদি মনে করেন তাদের ক্যারিয়ার অনিশ্চিত, তাহলে কাজে স্বাভাবিক উদ্যম থাকে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি বিশেষ দলের অনুগতদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। তাই রাজনৈতিক সরকারের সময় কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন অনেকে মনে করছেন সবই চলছে আগের মতো। অথচ সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দক্ষ ও উদ্যমী প্রশাসন প্রয়োজন “
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ব্যতিক্রমী ও সীমিত পর্যায়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে পদোন্নতির স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের সুপারিশ হলোÑ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করা; নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন করা; নীতিনির্ধারণী পদে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে পেশাদার দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া; প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা; তরুণ ও প্রযুক্তিবান্ধব কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আনা।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সরকারের নীতিগত নিয়ন্ত্রণ থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশাসনের পেশাদার কাঠামো দুর্বল হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হয় সরকারের। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যদি ব্যতিক্রমের বদলে নিয়ম হয়ে যায়, তাহলে প্রশাসনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়বে। তখন শুধু পদোন্নতি-বঞ্চনাই নয়, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।