জ্বালানির বৈশ্বিক সংকট ক্রমশ বাড়ছে। সেই সঙ্গে গ্যাসের দেশীয় উৎসগুলো থেকে উৎপাদন ক্রমেই কমছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শিগগিরই মিটছে না জ্বালানি খাতের সংকট। জ্বালানির বৈশ্বিক সংকট ক্রমশ বাড়ছে। সেই সঙ্গে গ্যাসের দেশীয় উৎসগুলো থেকে উৎপাদন ক্রমেই কমছে। ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশে ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি চলছে। যেভাবে উৎপাদন কমছে তাতে ভবিষ্যতে ঘাটতি আরও বাড়বে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত দেশে নতুন করে আরও অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় উৎসগুলোর ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিজস্ব সক্ষমতা না থাকায় এবারও বিদেশি অনুসন্ধান কোম্পানির ওপরই নির্ভর করতে হবে।
ফলে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঘাটতি দ্রুত মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য বিকল্প হিসেবে দ্রুত আমদানি বৃদ্ধির দিকে নজর না দিলে সামনের দিনে গ্যাস সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এতে দেশীয় উৎপাদন ও কর্মস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকট সমাধানে বিএনপি সরকার শুরু থেকেই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বিদেশি তেল উত্তোলন কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আপত্তি বিবেচনা করে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং কাজের বাধ্যবাধকতার শর্তে সংশোধন এনে নতুন ‘মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং চুক্তি’ (পিএসসি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সংশোধিত আর্থিক ও চুক্তিগত শর্তে ২৬টি অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। অফশোরের পাশাপাশি স্থলভাগে ২১টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে।
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগামী ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানির দিকে যেতে চায়।
গত ১৯ এপ্রিল মন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৪-এর অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের পিএসসি (উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি) পর্যালোচনার ভিত্তিতে মডেল পিএসসি ২০২৩ হালনাগাদ করার লক্ষ্যে খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রণীত খসড়ার ওপর লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। প্রণীত খসড়া ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ চূড়ান্ত অনুমোদনের পর হালনাগাদ করা পিএসসির আওতায় গভীর ও অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে নতুন গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার উৎপদন বৃদ্ধির বিষয়ে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে চায় সরকার।’
অতীতেও ব্যর্থ হয়েছে একাধিক উদ্যোগ
বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। ২০১০ সালে ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও কোনো গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই তারা ব্লকগুলো ছেড়ে দেয়। ২০১৬ সালে শেষবার দরপত্র ডাকা হলেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায়নি। এরপর ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। পরে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের মডেল পিএসসি তৈরি করা হয়। সর্বশেষ মডেল পিএসসি-২০২৩-এর আলোকে ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সোন মবিলসহ ৭টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্র কিনেছিল। এর মধ্যে ২টি কোম্পানি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ডেটাও কিনেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে তারা শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি। পাশাপাশি গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের পাঁচ বছরের গড় দামের ১১ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে, যেখানে তেলের দামের ন্যূনতম ৭০ এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার সীমা থাকবে। অগভীর সমুদ্রে এ হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতেই পিএসসি সংশোধন
বিনিয়োগকারীদের সাড়া না পাওয়া ও দীর্ঘ দিনের দাবির প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের মডেল পিএসসি তৈরি করা হয়। নতুন মডেল পিএসসি অনুযায়ী, অগভীর সমুদ্রে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার এবং গভীর সমুদ্রের জন্য ৭ দশমিক ২৬ মার্কিন ডলার। গ্যাস সম্পদ উত্তোলনে বাংলাদেশের অংশের হিস্যা বা মালিকানার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। অগভীর সমুদ্রে নতুন মডেলে বাংলাদেশের হিস্যা করা হয় ৪০-৬৫ শতাংশ, যা আগে ছিল ৫০-৮০ শতাংশ। গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের হিস্যা ৩৫-৬০ শতাংশ করা হয়, যা আগে ছিল ৫০-৭৫ শতাংশ। প্রয়োজনীয় শর্তসাপেক্ষে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়। পিএসসিতে যুক্ত নতুন শর্তানুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া ব্লকের ২০ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ টেন্ডার জয়ী কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে।
২০৩০ সালের আগে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই
সরকার সাগরে যে গ্যাস অনুসন্ধান কাজ শুরুর কথা বলছে তা অগভীর সমুদ্রে হলে এই অনুসন্ধান শেষে গ্যাস পেতে অন্তত ৬ বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ ২০৩০ সালের আগে পাওয়া যাবে না। আর গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কাজ শুরুর ১০ বছর পর, অর্থাৎ ২০৩৬ সালের আগে গ্যাস পাওয়া যাবে না। সেই হিসেবে সরকারের নতুন উদ্যোগে যদি বিনিয়োগকারী বিদেশি তেল অনুসন্ধান কোম্পানিগুলো (আইওসি) সাড়াও দেয় তাহলে এখনই সুফল পাওয়া যাবে না ।
গ্যাস সংকট আরও বাড়বে
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এখন দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হয় দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে করে এখনই দেশে ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে এই পার্থক্য সত্ত্বেও রেশনিং করে মোটামুটিভাবে গ্যাস সংকট মোকাবিলা করা হয়। পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের বৃহৎ গ্যাস উৎপাদকারী উৎস বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রতিনিয়ত গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এটা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি ২০২৮ সালের শেষে কিংবা ২০২৯ সালের শুরুতে তাদের গ্যাসের উৎপাদন ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে। একই সঙ্গে দেশের অন্য খনিগুলোর উৎপাদনও কমতে শুরু করেছে। দেশের মধ্যে নতুন করে যে কূপ খনন হচ্ছে, তা দিয়ে অন্য খনিগুলো থেকে উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ হলেও বিবিয়ানার বিশাল ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে না।
সঠিক সমীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমামের মতে, বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের পূর্বাংশে এলাকাবিশেষে অনুসন্ধান জোরালো দেখা গেলেও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর অংশে গ্যাসের অনুসন্ধান হয়েছে সামান্য। দেশের সম্ভাবনাময় সমুদ্রবক্ষও জোরালো গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি।
তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার ও ভারত একই সাগরে তাদের অংশে জোরালো অনুসন্ধান করে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। এজন্য দ্রুত বঙ্গোপসাগরে অগভীর ও গভীর সব জায়গায় অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। পাশাপাশি স্থলেও গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে।
দ্রুত সমাধানের পথ আমদানি বৃদ্ধি
সূত্রমতে, আগামী তিন বছরে গ্যাসের যে ঘাটতি হবে তা দ্রুত পূরণের নিজস্ব সক্ষমতা পেট্রোবাংলার হাতে এই মুহূর্তে নেই। একমাত্র ভোলার গ্যাস খনিতে এই মুহূর্তে অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন হলেও সমস্যা হচ্ছে, ভোলার সঙ্গে কোনো গ্যাস গ্রিডের সংযোগ নেই। বর্তমান সরকার ভোলা-বরিশাল-খুলনা ১৯৬ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার দ্রুত চাইলেও দরপত্র আহ্বান করে নানা প্রক্রিয়া শেষ করে এক বছরের মধ্যে পাইপলাইনের কাজ দিতে পারবে না। এই অবস্থায় এলএনজি আমদানি ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং দেশীয় কোম্পানি সামিট এলএনজির দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এর সঙ্গে আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।