আসন্ন ঈদুল আজহার আগে ও পরে বাড়তি অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ পেশাদার ডাকাত চক্র। প্রতীকী ছবি
আসন্ন ঈদুল আজহার আগে ও পরে বাড়তি অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ পেশাদার ডাকাত চক্র। এবার তাদের প্রধান টার্গেট মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কোটি টাকার কালেকশন, গরুর হাটে ব্যাপারীদের নগদ অর্থ এবং স্বর্ণের দোকানগুলো। তবে এসব পেশাদার অপরাধী তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশ। নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি রাজধানী-মহাসড়কে বাড়ানো হয়েছে বিশেষ টহল। ইতোমধ্যে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের পাঁচ সদস্যকে অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই নগদ অর্থ লেনদেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় বিশেষ করে বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ জমা থাকে। হাট থেকে পশু বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন ব্যাপারীরা। স্বর্ণের দোকানেও লেনদেন এ সময় অনেক বেড়ে যায়। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্র। বিশেষ করে মহাসড়ক, জনাকীর্ণ এলাকা এবং ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বহনের সময় হামলার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানাচ্ছে, সম্প্রতি মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের সময় তারা জানতে পারেন, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব চক্র অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করে বড় ধরনের ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানো হয় এবং পরে একটি চক্রকে হাতেনাতে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে ডাকাতির পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল এমন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পাঁচজন সদস্যকে আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করেছি। তারা বিকাশ ও নগদ এজেন্টদের কালেকশনের টাকা লুটের পরিকল্পনা করেছিল। তারা ঢাকার পাশের একটি জেলার স্বর্ণের দোকানে ডাকাতিও করতে চেয়েছিল।’
প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জ এলাকার শহীদ ফারুক রোডে অভিযান চালিয়ে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ মো. লিটন জব্বার, ইসমাইল হোসেন মামুন, মো. বাবুল বাবু, আইয়ুব ভূইয়া ও মো. রোমান। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, সাত রাউন্ড গুলি, ২ কেজি ২০০ গ্রাম বিস্ফোরক, একটি চাপাতি এবং দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতি করে আসছিল। তারা যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধ অস্ত্র, গানপাউডার এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহ করত। পরে সেসব দিয়ে হাতবোমা তৈরি করে ডাকাতির সময় ব্যবহার করত। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছেও এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক বিক্রি করত তারা। গোয়েন্দাদের ভাষ্য, ডাকাতির সময় চক্রটি প্রথমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। এরপর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান মালামাল লুট করত। ঈদের আগে নগদ অর্থের লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় এ সময়টিকে তারা বড় সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
একটি পৃথক মামলার তদন্ত করতে গিয়ে গোয়েন্দাদের হাতে এই চক্রের তথ্য আসে। পরে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা নানা কৌশলে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। কখনও ভুয়া পরিচয়, আবার কখনও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তদন্তের গতিপথ অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারিতে পুরো চক্রই ধরা পড়েছে।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তাদের ছবি দেখে শনাক্ত করেছি। তদন্তে এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, এই পাঁচজনের নামে অন্তত ১৪টির বেশি মামলা রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত।’
ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি মাঠে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত ৫৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। এর মধ্যে ডিএমপির তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ১৫৪ জন এবং চাঁদাবাজদের সহযোগী ১৩২ জন। এছাড়া ২৬১ জন ছিনতাইকারী এবং ১৮ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মহাসড়ক, পশুর হাট, ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট পয়েন্ট এবং স্বর্ণের দোকানগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ডিবিপ্রধান বলেন, ‘ঈদের আগে অপরাধীরা যাতে সংগঠিত হতে না পারে, সেজন্য সম্ভাব্য অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। রাতে প্যাট্রোল টিম ও মোবাইল পার্টির টহল বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহভাজন অপরাধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।’
জানতে চাইলে মোবাইল ব্যাংকিং অপারেটর নগদের জনসংযোগ কর্মকর্তা সজল জাহিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সবসময় বলছি, বড় অঙ্কের লেনদেন যেন ব্যাংকের মাধ্যমে করা হয়। ঈদের সময় আমরা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কিছু শাখা খোলা রাখার চেষ্টা করি, যাতে নিরাপদে লেনদেন করা যায়।’ ডিস্ট্রিবিউটর ও এজেন্টদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরিপূর্ণভাবে ব্যাংকে লেনদেন করার জন্য আমরা উৎসাহিত করছি। তাহলে নগদ টাকা পরিবহনের ঝুঁকি কমবে। আর যদি বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বহন করতেই হয়, তাহলে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হবে। পুলিশের নিরাপত্তা ছাড়া নগদ টাকা নিয়ে রাস্তায় না নামাই ভালো।’