তোফাজ্জল হোসেন কামাল
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ০৮:৩৬ এএম
রাশিয়া থেকে কেনা এমআই-১৭১এ২ হেলিকপ্টার যুক্ত হলে আকাশপথেও সক্রিয় হবে বাংলাদেশ পুলিশ। ছবি: জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্সের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
শেষ পর্যন্ত পুলিশের জন্য রাশিয়া থেকে আসছে ৪২৮ কোটি টাকায় কেনা দুটি হেলিকপ্টার। বাহিনীর দীর্ঘদিনের বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘এভিয়েশন পুলিশ’ প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় ছিল এই হেলিকপ্টার।
এমআই-১৭১ এ-২ মডেলের এই হেলিকপ্টার দুটি হাতে পাওয়ার পর পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে পুলিশের এই সংস্থাটি। আর ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত হবে পুলিশ।
হেলিকপ্টার দুটি সংযোজন হলে দেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস দমন, দুর্গম-প্রত্যন্ত অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা এবং নজরদারিতে পুলিশ আরও তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখতে পারবে।
‘এমআই ১৭১এ২’ মডেলের হেলিকপ্টার ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৮০ কিলোমিটার বেগে উড়তে সক্ষম। একবার জ্বালানি নিয়ে উড়তে পারে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার কেজি ওজন পরিবহনে সক্ষম। তবে এগুলো সামরিক কোনো কাজে ব্যবহার উপযোগী নয়।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এভিয়েশন শাখার সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি) খন্দকার গোলাম মওলা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এভিয়েশন পুলিশ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। এটা বাহিনীর ও আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এই নতুন ইউনিটটির চাহিদা দীর্ঘদিনের। এখন এটি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এই ইউনিটের যাত্রা শুরুর পর বাহিনীর সক্ষমতা বাড়বে। অপরাধ দমনে পুলিশ কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা সূত্র জানায়, এভিয়েশন পুলিশ প্রতিষ্ঠা হলে বাহিনীতে সংযোজিত হবে নতুন এক ইউনিট। এর মাধ্যমে স্থল ও জলের পর আকাশপথেও নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনায় এক ধাপ এগিয়ে যাবে পুলিশ।
সূত্র জানায়, সাধারণ পুলিশিংয়ের পাশাপাশি দেশে উগ্রবাদ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানব পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত আসা-যাওয়ার জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি এভিয়েশন পুলিশ ইউনিটের প্রয়োজন ছিল। এজন্য পুলিশের জন্য দুটো হেলিকপ্টার কেনার প্রস্তাব দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। ইতোমধ্যে ৬ জন পুলিশ অফিসারকে পাইলট ও ৪০ জন বিভিন্ন স্তরের পুলিশ অফিসারকে হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্গম এলাকায় সন্ত্রাস দমনে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়া থেকে দুটি হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত হয়। গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জি টু জি) পদ্ধতিতে ৪২৮ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৬ টাকায় রাশিয়া থেকে হেলিকপ্টার দুটি কিনতে ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ পুলিশ ও জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্সের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক আন্দ্রে আই ভোগেনিস্কি স্মারকে সই করেন।
২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সচিবালয়ে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পুলিশের জন্য দুটি হেলিকপ্টার কিনতে একটি প্রস্তাব দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ওই বছরের ১৯ নভেম্বর ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়।
সূত্র জানায়, ২০২১ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বেশকিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্সের নামও ছিল। অথচ একই বছরের নভেম্বরে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্সের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার চুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম কিস্তিতে ২১৪ কোটি ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৫৮ টাকা, দ্বিতীয় কিস্তিতে ৮৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬৩ টাকাসহ মোট ২৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫২১ টাকা পরিশোধ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার কথা জানার পরও তৎকালীন সরকার চুক্তির পর দফায় দফায় টাকা পরিশোধ করার কারণে তখন বেশ সমালোচনা হয় সরকারের ভেতরে বাইরে। চুক্তি মূল্যের অবশিষ্ট টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টার দুটি বাংলাদেশে আনা সম্ভব হয়নি। বছরের পর বছর অলস বসে থাকেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের করা ওই চুক্তি নিয়ে বিপাকে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা হেলিকপ্টার দুটি আনার উপায় খোঁজা শুরু করে। কূটনৈতিক উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করে হেলিকপ্টার দুটি কীভাবে আনা যায়। সে অনুযায়ী দুদেশের মধ্যে চিঠি চালাচালি শুরু হয়।
সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য গত বছরের ৩১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটা বিহিত করার অনুরোধ জানায়। চিঠি পাওয়ার পর রাশিয়ার সঙ্গে করা চুক্তির শর্তগুলো পর্যালোচনা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, হেলিকপ্টার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্স গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি এবং এপ্রিলে দ্বিতীয়টি পাঠাতে কার্গো বিমান ভাড়া করেছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞা থাকায় হেলিকপ্টার আনার প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয় বাংলাদেশ সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, হেলিকপ্টার দুটি তখন রাশিয়ার ওয়্যারহাউসে (গুদাম) রাখা ছিল। রক্ষণাবেক্ষণে খরচও হচ্ছে। চুক্তিপত্র অনুযায়ী হেলিকপ্টার না নিলে আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। একপর্যায়ে রাশিয়া দুটি হেলিকপ্টারের সরবরাহ স্থগিত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হেলিকপ্টার সরবরাহ স্থগিত রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজি) চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, জেএসসি রাশিয়ান হেলিকপ্টার্স কোম্পানির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই পুলিশের জন্য জিটুজি পদ্ধতিতে কেনা হেলিকপ্টারের সরবরাহ পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হেলিকপ্টার সংযোজনের বিষয়টির সর্বশেষ অবস্থা জানতে গিয়েই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। জিটুজি পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার কেনা হলেও এর মধ্যস্থতাকারীকে ক্রয়মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে। এ মধ্যস্থতাকারী হচ্ছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপির ক্যাশিয়ার। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও ৮ জন কর্মকর্তা প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) করতে রাশিয়া সফর করেছেন। আট সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ ও এমটিএমসি) মো. নাসির উদদৌলা।
পুলিশের বিশেষ শাখা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের এয়ার উইংয়ে দুটি হেলিকপ্টার আছে। পুলিশের এয়ার উইং থাকলেও জনবল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এজন্য পুলিশ আকাশযান সংযোজনের উদ্যোগ নেয়। যুক্তি ছিল, হেলিকপ্টার সংযুক্ত হলে স্থল, নৌ ও আকাশ পথে পুলিশের ত্রিমাত্রিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের জুলাই মাসে চারজন অফিসারকে বেসিক বিমান চালনা প্রশিক্ষণের জন্য আর্মি এভিয়েশন স্কুলে পাঠানো হয়। তারা হলেনÑ মুশফিকুর হক (৩৫তম বিসিএস), সারোয়ার হোসেন (৩৫তম বিসিএস), ফাতেমা তুজ জোহরা (৩৬তম বিসিএস) এবং আবুল হোসেন (৩৭তম বিসিএস)। ২০২২ সালের ১৬ মার্চ তাদের একক বিমান প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। বেশ কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টর এবং কনস্টেবল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) এয়ার উইংয়ের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে একজন সহকারী মহাপরিদর্শক পুলিশ এভিয়েশন উইংয়ের দায়িত্বে আছেন।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এডিশনাল ডিআইজি-ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট) মো. আশরাফুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হেলিকপ্টার সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে সরকার কাজ করছে। দুদেশের মধ্যেই কূটনৈতিক পর্যায়ে চিঠি চালাচালি শেষে এখন হেলিকপ্টার দুটি দেশে আনার চেষ্টা চলছে। শিগগিরই পুলিশ এভিয়েশনে হেলিকপ্টার দুটি যুক্ত হবে।’
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে হেলিকপ্টার আনার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় হেলিকপ্টার দুটি আনার পথ সুগম হয়েছে।