সাক্ষাৎকারে মার্গো থর্নটন
জাহাঙ্গীর সুর
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১০:৫৭ এএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৬ ১১:৩৮ এএম
মহাবিশ্বের বিশালতায় আমরা কতটা একা? ? স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রে ট্যাটুইন গ্রহে দ্বৈত সূর্যের আলোয় লুকে স্কাইওয়াকারের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
যেন কল্পনা ধরা দিল বাস্তব রূপে। ‘স্টার ওয়ার্স’ যারা দেখেছেন, তারা কাল্পনিক মরু-গ্রহ ‘ট্যাটুইন’-এর কথা জানেন। লুক স্কাইওয়াকারের সেই আবাসভূমির মতোই মহাবিশ্বের সুদূরেÑ ৬৫০ থেকে ১৮০০ আলোকবর্ষ পরেÑ এমন ২৭টি সম্ভাব্য নতুন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এসব দূরগ্রহ একটি নয়, বরং একসাথে দুটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সেখানে রোজ দুবার সূর্যোদয় ও দুবার সূর্যাস্ত। এই গবেষক দলের প্রধান লেখক মার্গো থর্নটন। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের এই পিএইচডি গবেষক তার মহাজাগতিক অনুসন্ধান নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সঙ্গে। তিনি বলেছেন, আমাদের মহাবিশ্ব কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও ঐশ্বর্যে ভরপুর। ইমেইলে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহাঙ্গীর সুর
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: আমাদের বাড়ি থেকে দূরে, বহুদূরে জোড়া নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকা ২৭টি নতুন গ্রহের সন্ধান দিয়েছেন আপনি। এই গল্প আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আপনাকে অভিনন্দন।
মার্গো থর্নটন: ঢাকা থেকে যোগাযোগ করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমাদের এই নতুন আবিষ্কারটি বাংলাদেশের পাঠকদের মনে এমন গভীর রেখাপাত করেছে জেনে সত্যিই আনন্দ হচ্ছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: আলোর ছাপ দেখে কীভাবে এমন মহাজাগতিক রহস্য আপনারা উন্মোচন করতে পারলেন?
মার্গো থর্নটন: যখন দুটি নক্ষত্র একে অপরকে প্রদক্ষিণ করে এবং আমাদের দৃষ্টিসীমা থেকে একে অপরকে আড়ালে রেখে এক মহাজাগতিক গ্রহণের সৃষ্টি করে, তখনও চাইলে আমরা সেই গ্রহণের সময়কাল নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারি। কোনো গ্রহ যখন এ রকম কোনো জোড়া নক্ষত্রব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে ঘোরে, তখন সেই গ্রহের নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ওই নক্ষত্রদ্বয়ের কক্ষপথে ধীর কিন্তু এক ছন্দময় পরিবর্তন আসে। আর ঠিক এই ব্যাপারটিই ওই গ্রহণের সময়কালের মাঝে একটি অনন্য ‘ছাপ’ বা চিহ্ন রেখে যায়। নাসার টেস স্যাটেলাইট বছরের পর বছর ধরে আমাদের কাছে যে নিরবচ্ছিন্ন ও নিখুঁত তথ্য পাঠিয়ে যাচ্ছে, তার কল্যাণেই এই প্রথমবারের মতো ব্যাপারটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: এ রকম কোনো গ্রহে একটি সাধারণ দিন দেখতে কেমন হবে?
মার্গো থর্নটন: আমাদের শনাক্ত করা বেশিরভাগ গ্রহই মূলত গ্যাসীয় দানব। অর্থাৎ সেখানে পা রাখার মতো কোনো কঠিন মাটি নেই। তবে আপনি যদি কোনোভাবে ওই গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে ভেসে থাকতে পারতেন, তবে এক অভাবনীয় আকাশের দেখা পেতেন। আপনি আকাশে দুটি সূর্য দেখতে পেতেন। গ্রহটি তার কক্ষপথের কোথায় অবস্থান করছে, এর ওপর ভিত্তি করে সূর্য দুটি কখনও একে অপরের খুব কাছাকাছি, আবার কখনও দূরে সরে যেত। সেখানে রোজ দুবার সূর্যোদয় ও দুবার সূর্যাস্ত হতো, যদিও সেগুলো সবসময় একই সময়ে ঘটত না। আর সেখানকার ঋতুবৈচিত্র্য হতো পৃথিবীতে আমাদের অভিজ্ঞতার চেয়ে বহুগুণ বেশি জটিল। সেই আকাশে কোনো দৃশ্যই কখনও দ্বিতীয়বার হুবহু একরকম মনে হতো না, প্রতি মুহূর্তেই আকাশ এক নতুন ক্যানভাসে রূপ নিত।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্গো থর্নটন
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: আমরা কি জোড়া নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী বাসযোগ্য কোনো গ্রহ আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছি?
মার্গো থর্নটন: সম্ভাবনা আছে। আমাদের এই নতুন পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অভীষ্ট গ্রহটিকে আমাদের সাথে একই সমতলে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর মানে হলো, জোড়া নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণরত গ্রহ (সারকামবাইনারি প্ল্যানেট) শনাক্ত করতে পারব, যা আগের সব গবেষণার চোখে একেবারে অদৃশ্য ছিল। আমাদের গবেষণার ফল যদি সত্যিই ইঙ্গিত দেয় যে, জোড়া নক্ষত্রব্যবস্থায় হরহামেশাই গ্রহরা গড়ে ওঠে, তা হলে বলা যায়, এর অন্তত একটি ক্ষুদ্র অংশ নিশ্চিতভাবে এমন কোনো বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে তরল জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল। আমরা এখনও সে রকম কোনো গ্রহের সন্ধান পাইনি ঠিকই, তবে আবিষ্কারের প্রতিটি নতুন পদ্ধতি আমাদের সেই লক্ষ্যের আরও একধাপ কাছে নিয়ে যাচ্ছে। আর এমন একটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া মানেই হলো, প্রাণ সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ হয়তো মহাবিশ্বের এমন সব বিচিত্র জায়গায় লুকিয়ে আছে, যা একসময় আমাদের কল্পনারও অতীত ছিল।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: সাধারণ মানুষের কাছে এই আবিষ্কারের মাধ্যমে আপনি মূলত কোন বার্তাটি পৌঁছে দিতে চান?
মার্গো থর্নটন: বার্তাটি হলোÑ আমাদের মহাবিশ্ব কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও ঐশ্বর্যে ভরপুর, আর এখনও অনেক কিছুই আবিষ্কার করা বাকি। আমরা মাত্র এক হাজার ছয়শর কম নক্ষত্রমণ্ডল নিয়ে কাজ করেছি। অথচ, শুধু গায়া ক্যাটালগেই এমন ২০ লাখেরও বেশি নক্ষত্রমণ্ডল রয়েছে। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা তরুণ ও স্বাপ্নিকদের উদ্দেশে আমার একটাই কথা : আবিষ্কারের যুগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তোমাদের জীবদ্দশায় মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর অনেক কিছুই হয়তো এখনও অধরা রয়ে গেছে। আর আগামী দিনের সেই অভাবনীয় আবিষ্কারগুলোর বেশকিছু হয়তো আজকের দিনের তোমাদের মতো শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই আলোর মুখ দেখবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: আমাদের নিজেদের পৃথিবী যখন এত এত সংকটের মুখে, তখন আমরা কেন নতুন গ্রহের সন্ধানে ছুটে বেড়াই?
মার্গো থর্নটন: আমার মনে হয় না যে, মহাকাশ অনুসন্ধান ও নিজেদের পৃথিবীর প্রতি যত্নশীল হওয়াÑ এই দুটি কাজ একে অপরের প্রতিযোগী; বরং এরা গভীরভাবে একসূত্রে গাঁথা। যখনই আমরা মহাকাশের অসীমে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তখনই আমরা নতুন করে উপলব্ধি করতে পারি, আমাদের এই পৃথিবী কতটা বিরল আর কতটা ভঙ্গুর। ঠিক পৃথিবীর মতো দ্বিতীয় কোনো স্থান এই ব্রহ্মাণ্ডে নেই [অন্তত এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি]। অসীমের অতলান্তে অন্য গ্রহের জন্য এই প্রাণান্ত অনুসন্ধান আমাদের নিজেদের নীড়কে এমন এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে চিনতে শেখায়, যা অন্য কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তা ছাড়া বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আমরা যে প্রযুক্তি ও কৌশলগুলো রপ্ত করেছি (যেমন : নিখুঁত পরিমাপ, সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রীতি বা সহযোগিতা)Ñ ঠিক এগুলোই তো আমাদের পৃথিবীর বর্তমান সংকটগুলো মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সর্বোপরি এই সংঘাত আর অভাবের যুগে, দেশ-কাল-ভাষার সীমানা পেরিয়ে মানুষ যখন একসাথে আকাশের পানে তাকায়, আর অনন্ত মহাকাশে কী লুকিয়ে আছে সেই রহস্যের উত্তর খোঁজেÑ আমি মনে করি, এটাই মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মানবিক প্রবৃত্তি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: আপনার কাছ থেকে শুনতে পেরে খুব ভালো লাগল। আপনার অন্তর্দৃষ্টি বা ধারণাগুলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা।
মার্গো থর্নটন: এমন চমৎকার আর ভাবনাসঞ্চারী প্রশ্নগুলোর জন্য আপনাকে আরও একবার ধন্যবাদ জানাই। আপনার চমৎকার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি আশা করি, আপনাদের পাঠকরা এই গল্পটি উপভোগ করবেন। তাদেরও শুভেচ্ছা।