নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬ ১৫:০৮ পিএম
ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও পুলিশি অবকাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানী ঢাকার বিস্তৃতি বাড়ছে। বাড়ছে জনসংখ্যা ও অপরাধের ধরনও।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের খুনোখুনি, আধিপত্যের দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদক কারবার, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ও সাইবার অপরাধীদের সক্রিয়তায় আতঙ্কিত ঢাকাবাসী।
রাত নামলেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে যায় ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য।
এসব কারণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নতুন থানা, বাড়তি ফোর্স মোটকথা আক্রমণাত্মক পুলিশিংয়ে ঢাকাকে ‘ক্লোজ সার্ভেইলেন্স সিটি’তে রূপ দিতে যাচ্ছে ডিএমপি।
১১ হাজার সিসি ক্যামেরা ছাড়াও আরও নতুন চারটি থানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পূর্বাচলেও চারটি থানা স্থাপনে প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ট্রাফিক ডিভিশন, এমটিও ওয়ার্কশপ ও পুলিশ লাইনস স্থাপনের জন্য ছয় হাজার ফোর্সের চাহিদাও নির্ধারণ করেছে ডিএমপি।
বসছে ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা
ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পুরো ঢাকা মহানগরকে নজরদারির জালে ঢাকতে বড়সড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে (ডিএমপি)। অপরাধ দমনে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, অপরাধপ্রবণ স্পট ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একযোগে বসানো হচ্ছে আরও ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা।
একই সঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে ব্লক রেইড, চেকপোস্ট, সাদা পোশাকের গোয়েন্দা নজরদারি এবং মোতায়েন হচ্ছে অতিরিক্ত পুলিশ।
ডিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবার হার্ডলাইনে যাওয়ার কৌশলে এগোচ্ছে পুলিশ। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, আদাবর, হাজারীবাগ, বছিলা, বাড্ডা, ভাটারা, খিলক্ষেত ও পূর্বাচল এলাকাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে এসব এলাকা বাড়তি নজরদারির মধ্যে আনা হচ্ছে।
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার শুক্রবার বলেন, ঢাকায় নতুন করে ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর এলাকাতেই বসানো হবে ৭০০ ক্যামেরা।
তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস ও ছিনতাই বেড়েছে। ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা অপরাধ করছে। আমরা তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনব। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করাকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।
তিনি জানান, শুধু ক্যামেরা বসিয়েই থেমে থাকছে না ডিএমপি। অপরাধপ্রবণ এলাকায় বাড়ানো হচ্ছে টহল, বসানো হচ্ছে চেকপোস্ট এবং পরিচালিত হচ্ছে ব্লক রেইড অভিযান। ঢাকার ৫০টি থানায় অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি), সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ও পেট্রোল ইন্সপেক্টর দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের বসিলায় নতুন পুলিশ ফাঁড়ি উদ্বোধন করা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় আরও একটি নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্লক রেইড ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ডিএমপির আওতায় ১ হাজার ৯১০টি সিসি ক্যামেরা সচল রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শনাক্তের পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণেও সফলতা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৭১০টি এবং গুলশান-বনানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাড়ি মালিক সমিতি ও ‘ল অ্যান্ড অর্ডার কো-অর্ডিনেশন কমিটির’ আওতায় আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ ক্যামেরা পরিচালিত হচ্ছে।
এসব এলাকায় অপরাধের হার কমে এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থায়ী ক্যামেরার পাশাপাশি বড় জাতীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবকেন্দ্রিক অস্থায়ী নজরদারিও বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা ২৬ মার্চের মতো অনুষ্ঠানকে ঘিরে অস্থায়ী ক্যামেরা বসানো হয়। এবারের পহেলা বৈশাখে প্রায় পৌনে দুইশ ক্যামেরা বসানো হয়েছিল।
ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক ক্যামেরা মনিটরিং করা হচ্ছে। কোনো ক্যামেরা বিকল হলে সঙ্গে সঙ্গে তা মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা হয়। কন্ট্রোল রুমে কোনো অপরাধমূলক ঘটনা ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে রেসপন্স টিম পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরও চার নতুন থানা হচ্ছে
অপরাধ দমনের পাশাপাশি ঢাকার পুলিশি কাঠামোও ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, ঢাকা মহানগরে আরও চারটি নতুন থানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার থানার প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মোহাম্মদপুর, আদাবর ও হাজারীবাগের কিছু অংশ নিয়ে আরেকটি নতুন থানা গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভাটারা, বাড্ডা ও খিলক্ষেত এলাকার অংশ নিয়ে ‘বসুন্ধরা থানা’ এবং খিলগাঁও এলাকায় আরও একটি নতুন থানা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পূর্বাচলকে ঘিরেও বিশাল নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে ডিএমপি। পূর্বাচল এলাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে সেখানে চারটি থানা ও ছয়টি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।
পাশাপাশি ট্রাফিক ডিভিশন, এমটিও ওয়ার্কশপ ও পুলিশ লাইনস স্থাপনের জন্য ছয় হাজার ফোর্সের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত কয়েক মাসে ডিএমপির প্রায় আট হাজার সদস্যের নতুন আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এর মধ্যে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়িতে থাকবে ১ হাজার ৬০০ ফোর্স, ডেমরা পুলিশ লাইনসে আরও ১ হাজার ৬০০ সদস্যের আবাসন হচ্ছে। মিরপুর পুলিশ লাইনসের ২০ তলা ব্যারাকে থাকবে ২ হাজার ২০০ ফোর্স।
পূর্বাচলে পুলিশের ২০ তলা ভবনে ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি ডিভিশন ও ট্রাফিক উত্তর বিভাগের ৮০০ থেকে ৯০০ সদস্য অবস্থান করবেন। দিয়াবাড়ির ১০ একর জায়গাজুড়ে নতুন পুলিশ অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।
বসিলা পুলিশ লাইনসে ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের অফিস স্থাপন করা হয়েছে। রাজারবাগের অতিরিক্ত চাপ কমাতে এমটিও ওয়ার্কশপও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বছিলায় চালু হয়েছে ডিএমপির মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল।