জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জোরদার হচ্ছে বিরোধীদের আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীত
গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার ও সংস্কার পরিষদ গঠন প্রশ্নে শুরু থেকেই জাতীয় সংসদে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বোধীন বিরোধী দল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিন ১২ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল শেষ দিন পর্যন্ত এই বিষয়ে ব্যাপক বিতর্ক চালিয়ে যায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। অন্যদিকে সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান সংবিধানে না থাকাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের কথা জানায়।
এ অব্স্থায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরকারি দলের তরফ থেকে যথাযথ সাড়া না পাওয়ায় দাবি আদায়ে রাজপথেও কর্মসূচি শুরু করে বিরোধীদলীয় জোট। এই ইস্যুতে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ। একই সঙ্গে দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভাগীয় সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ১৬ মে রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথাও জানানো হয়েছে। রাজনীতি সচেতন মহল মনে করছে, এর মধ্য দিয়ে সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে জোরদার হচ্ছে বিরোধীদের আন্দোলন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে সরকারি দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের মধ্যে প্রকাশ্যে মতপার্থক্য শুরু হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার করার কথা থাকলেও সরকারি দল সেই পথে হাঁটেনি। বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে পৃথক শপথ নেন। কিন্তু সংবিধানে না থাকার কথা উল্লেখ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেনি সরকারি দলের সদস্য। এ ছাড়া গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধের কথাও জানায়। এসব নিয়ে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরু থেকে ব্যাপক সোচ্চার ছিল বিরোধী দল। সংসদীয় বিতর্ক, নোটিস কিংবা ওয়াকআউটের মতো পন্থা অবলম্বন করতেও দেখা গেছে বিরোধী দলের সদস্যদের। তাতেও কাজ না হওয়ায় ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির পথেও হাঁটে। এসব কর্মসূচি থেকে সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
গত ২৪ এপ্রিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ আয়োজিত এক সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংসদে ও রাজপথে একসঙ্গে বিরোধী দলের আন্দোলন চলবে। সরকারি দল বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘এই রায় যদি না মানেন, মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, এই রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনে আমরা কোনো বিশ্রাম নেব না। আন্দোলন চলবে সংসদে, আন্দোলন চলবে রাজপথে।’
এদিকে ৩০ এপ্রিল সংসদ অধিবেশনের শেষ দিন পর্যন্ত সুরাহা না হওয়ার কারণে ওই দিনই সংস্কারের জন্য গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এই জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. হামিদুর রহমান আযাদ এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১৬ মে রাজশাহীতে, ১৩ জুন চট্টগ্রামে, ২০ জুন খুলনায়, ২৭ জুন ময়মনসিংহে, ১১ জুলাই রংপুরে, ১৮ জুলাই বরিশালে এবং ২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ হবে। এসব সমাবেশে সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় শহর ও জেলাকে সম্পৃক্ত করা হবে। সবশেষে আগামী অক্টোবরে রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে। এ ছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির বাইরে দলগুলো দলীয় ব্যানারে মতবিনিময়, সেমিনার, বিক্ষোভ, সমাবেশসহ আলাদা কর্মসূচি পালন করবে বলে জানান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ গতকাল শুক্রবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। আমরা দাবি আদায়ে দেশের প্রত্যেক জেলাতে নাগরিক সমাবেশ করব। জুনের শুরু থেকে সপ্তাহে তিনটি করে জেলার এই কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৫ আগস্ট ঢাকায় আমাদের একটা বড় প্রোগ্রাম দেওয়া আছেÑ গণমিছিল। সারা দেশে জেলা প্রোগ্রামগুলো করে ৫ আগস্ট ঢাকায় এই গণমিছিল আমাদের দলীয়ভাবে করা হবে। নাগরিক সমাবেশ মানে হলো দেশের যারা ভালো পেশাজীবী, এদের এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার জন্য এই সমাবেশ করব আমরা। আর ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আগামী ১৬ তারিখে রাজশাহী বিভাগে প্রথম প্রোগ্রাম সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মাঝে মাঝে কিছু সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম হবে।
এদিকে ১১ দলীয় জোটের শরিক একাধিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বিএনপির জুলাইবিরোধী অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরা। এ ছাড়া গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কারে বিএনপিকে বাধ্য করা। তবে বিরোধী দলের আন্দোলন শুধু এই ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, অর্থনীতিক চাপে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে বাধ্য করার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকেও যুক্ত করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিও যুক্ত করা হবে। মূল দাবি আদায়ে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে এসব বিষয় যুক্ত করা হবে বলেও জানান তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকÑ সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মৌলিক বিষয়গুলোয় আমাদের ঐক্যের দরকার ছিল। কিন্তু আমাদের সরকারি দল ও বিরোধী দল কিছুটা মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। তবে এখন কিছুটা জটিলতার মধ্যে থাকলেও পরিস্থিতি কী হয় বলা যায় না। কারণ আওয়ামী লীগ ফিরে এলে কী হবে, সেই ভীতি সবারই আছে।
তবে বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিরোধী দলগুলোকে মাঠের রাজনীতিতে জানান দিতে, নিজের কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা রাখতে ও জনসমর্থন নিজেদের পক্ষে আনতে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে সরকারি দলকেও তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে হবে। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে জনপ্রিয়তা ধেরে রাখতে হবে। তাই এটাকে আমি রাজনীতি হিসেবেই দেখছি।