× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নৌপথের শৃঙ্খলায় শুরু হচ্ছে নৌযানশুমারি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬ ১১:৪৭ এএম

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের লোগো। ছবি: সংগৃহীত

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের লোগো। ছবি: সংগৃহীত

দেশের নদী, খাল আর সমুদ্রপথজুড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার নৌযান চলাচল করে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও বাণিজ্যের বড় একটি অংশ নির্ভর করে এই নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যÑ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও দেশে ঠিক কতগুলো নৌযান চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য কোনো জাতীয় তথ্যভাণ্ডার নেই।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার কাছে আংশিক তথ্য থাকলেও সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ জলসীমায় চলাচলকারী সব নৌযানের সমন্বিত হিসাব কখনও তৈরি হয়নি। ফলে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নৌপথ উন্নয়ন কিংবা দক্ষ জনবল তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরেই সীমাবদ্ধতা ছিল। এই বাস্তবতায় প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী ‘নৌযান শুমারি ২০২৬’ পরিচালনা করছে সরকার। 

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এই শুমারি। ‘নৌযানের ডেটাবেজ তৈরি ও নৌযান ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় গত বছরের ২১ আগস্ট নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিবিএসের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে শুমারির মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম, যা চলবে আগামী ১৭ মে পর্যন্ত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়াধীন বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি ও বিওএসের কাছে নিবন্ধিত প্রায় ২২ হাজার নৌযানের তালিকা রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে নদীপথে চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক ছোট ও মাঝারি নৌযানের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত বহু নৌযান এখনও নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। এ কারণেই সরকার এবার দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ জরিপের উদ্যোগ নিয়েছে। শুমারির লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার নৌযানের তথ্য সংগ্রহ।

বিবিএস জানিয়েছে, জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশকে ১ হাজার ২৮১টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে একজন তথ্য সংগ্রহকারী গড়ে ২০০টি নৌযানের তথ্য সংগ্রহ করছেন। পুরো কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন ৮৫ জন উপজেলা শুমারি সমন্বয়কারী, ৬৪ জন জেলা কর্মকর্তা এবং ৮ বিভাগের জন্য ৮ জন যুগ্ম পরিচালক। সব ধরনের ব্যয় বহন করছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

শুমারির আওতায় দেশের সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ জলসীমায় চলাচলকারী সব ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযানকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাম্ববার্জ এবং যেসব নৌযান নিজে ইঞ্জিনচালিত নয় কিন্তু অন্য যন্ত্রচালিত নৌযানের মাধ্যমে টেনে বা ধাক্কা দিয়ে পরিচালিত হয়, সেগুলোকেও শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে নৌবাহিনী বা সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন ও তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নৌযান এই কার্যক্রমের বাইরে থাকবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুমারির মাধ্যমে শুধু নৌযানের সংখ্যা নয়; বরং তাদের ধরন, মালিকানা, নিবন্ধন অবস্থা, ফিটনেস, ব্যবহার, রুট এবং পরিচালনাগত নানা তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ফলে প্রথমবারের মতো দেশের নৌ খাতের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

নৌনিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দেশে নৌ-দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে সঠিক তথ্যের অভাব। নদীপথে প্রতিনিয়ত যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে, তার বড় অংশের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ফিটনেসবিহীন নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনিবন্ধিত চলাচল এবং অদক্ষ চালক। কিন্তু সরকারের কাছে নির্ভুল তথ্য না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর নজরদারি সম্ভব হয় না। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো খাতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার। অথচ দেশের নৌ খাত এতদিন মূলত অনুমান-নির্ভর তথ্যের ওপর পরিচালিত হয়েছে।

বাংলাদেশে নদীপথের বিস্তৃতি প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে এই নৌপথ আরও সম্প্রসারিত হয়। প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথ ব্যবহার করেন। ফলে নৌ খাতের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুমারির মাধ্যমে সঠিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ রুটগুলোও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

বিবিএস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করছেন। ফলে তথ্য দ্রুত কেন্দ্রীয় সার্ভারে পৌঁছাচ্ছে এবং তাৎক্ষণিক যাচাইও সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, আগে কাগজ-নির্ভর জরিপে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ে সময় লাগত। এবার ডিজিটাল পদ্ধতির কারণে দ্রুত একটি নির্ভুল জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি করা সম্ভব হবে। এই ডেটাবেজ ভবিষ্যতে নৌরুট পরিকল্পনা, নদীবন্দর উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব নৌযান ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার এখন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই শুমারির তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে নাবিক ও মাঝিদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাবে। লাইসেন্সিং, দক্ষতা যাচাই এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নেও সহায়তা মিলবে। এ ছাড়া সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে নৌপথ ব্যবহারের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ নৌপথ তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল, পরিবেশবান্ধব এবং বৃহৎ পরিসরে পণ্য পরিবহনের জন্য কার্যকর।

তাদের মতে, নৌ খাতকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নৌযানের সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে গত ৪ মে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে নৌযান শুমারি শুরু হয়েছে, যা আগামী ১৭ মে পর্যন্ত চলবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থার কাছে নিবন্ধিত নৌযানের আংশিক তথ্য রয়েছে। এই শুমারির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, বিবিএস আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করছে। আশা করছি, এই তথ্য ভবিষ্যতে নৌনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা হ্রাস, দক্ষ নাবিক তৈরি এবং পরিকল্পিত নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি জানান, দেশের নৌ খাতকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই। আর নৌযান শুমারি সেই পরিকল্পনার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে।

 ‘নৌযান শুমারি সফল করি, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি’Ñ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে পরিচালিত শুমারি ঘিরে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশাও অনেক। কারণ দেশের নৌ খাত এতদিন যেভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করছিল, এবার তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা