নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের পাঁচহার হাওরে বুধবার বিকালে কোমরসমান পানিতে ধান কাটছেন কৃষক। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
এপ্রিলের শেষদিকে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
ফসলহানির শোক সইতে না পেরে কয়েকজন কৃষকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মানসিক আঘাতে কেউ কেউ স্ট্রোক করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে এখন চলছে আহাজারি।
একদিকে ঘরে নেই ফসল, অন্যদিকে ব্যাংক, বিভিন্ন এনজিও ও দাদনদারদের ঋণের চাপÑ সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হাওরের এ ব্যাপক ফসলহানি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, এবারের এ বিপর্যয়ের পেছনে কৃষি, পানি উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রশাসনের অদূরদর্শিতা এবং অবহেলাই প্রধান কারণ।
পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পানি আইন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, হাওরের জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির পেছনে মূলত দায়িত্বহীনতা ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপই দায়ী।
তার ভাষায়, এ ধরনের পরিস্থিতি একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাহলে বারবার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কেন?
তিনি বলেন, এ বিপর্যয়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি মন্ত্রণালয়, পানি মন্ত্রণালয় এবং কৃষকদের পরামর্শদাতা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)Ñ সবারই দায় রয়েছে।
তার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হচ্ছে ডিএই। কিন্তু তারা সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ড. আইনুন নিশাত কৃষকদেরও সম্পূর্ণ দায়মুক্ত রাখেননি। তিনি বলেন, কৃষকদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু শুধু অন্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
তার মতে, গত ১০০ বছরের ইতিহাসে এ সময়ের বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক ঘটনা। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি এটি স্বাভাবিক হয়, তাহলে এত বড় ক্ষতি হলো কেন?
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর বড় ধরনের বিপর্যয় না হওয়ায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এবারও কিছু হবে না। অথচ দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকা জরুরি ছিল।
তার প্রশ্ন, হাওরে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েও ধান কাটা শেষ হয়নি কেন?
পাহাড়ি ঢল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জেও এসেছে, কিন্তু সেখানকার কৃষকরা আগেভাগেই ধান কেটে নিরাপদে সরিয়ে নিতে পেরেছেন। তাহলে নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে এত ব্যাপক ক্ষতি হলো কেনÑ এ প্রশ্নও তিনি তুলে ধরেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, এপ্রিল থেকে জুনÑ এই সময়ের মধ্যে কালবৈশাখী ও ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অজানা নয়। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কৃষি কর্মকর্তাদের নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের যথাযথ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।
একই সঙ্গে সরকারকেও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তর শুরু থেকেই কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। বিপুল দায়িত্ব ও কর্মপরিধি থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমন অকার্যকর অধিদপ্তর থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, চলতি বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হতে পারে এবং তাতে ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছেÑ এ বিষয়ে গণমাধ্যমে আগেই নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
তার মতে, সরকার আগাম সতর্কবার্তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে ধরনের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সার্বক্ষণিক তদারকির প্রয়োজন ছিল, তার কোনো কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়েনি। এমনকি কৃষিমন্ত্রীকেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রায় দেড় মাস ধরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চললেও হাওরের এই সংকট নিয়ে সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনা হয়নি।
অন্যদিকে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশ্মির রেজা বলেন, হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বাঁধের ত্রুটি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার জন্য মূলত সরকার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড দায়ী।
তার অভিযোগ, সময়মতো বাঁধগুলোর সংস্কার ও মেরামত করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় হাওরাঞ্চলে যেসব টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে অন্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে এ সংকটের দায় নীতিনির্ধারণী মহলকেই নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার
ধরিত্রী রক্ষা আন্দোলনের (ধরা) সদস্য সচিব এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্সের কার্যনির্বাহী সদস্য শরীফ জামিল বলেন, হাওরে যা ঘটেছে তা অকাল বা আগাম বন্যা নয়; বরং এটি সাধারণ জলাবদ্ধতারই একটি রূপ।
তবে এই জলাবদ্ধতা গত কয়েক বছরে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তার মতে, হাওরের ইকো-সিস্টেম, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জলাধারগুলো সংরক্ষণ না করা পর্যন্ত এ ধরনের পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসবে।
এজন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, হাওর ও হাওরের ফসল রক্ষায় নির্মিত বাঁধগুলো প্রায়ই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তার মতে, এ ধারাবাহিক ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এর সঙ্গে সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতার অভাবও জড়িত।
তিনি আরও বলেন, কৃষকের লাখ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হওয়ার বিপরীতে তিন মাসে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া নিছক প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।
জবাব নেই হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের
বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), যুগ্ম সচিব মাহফুজা আকতার বলেন, কাবিখা প্রকল্প ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
হাওরে অতিভারী বৃষ্টিতে ফসলহানির বিষয়ে আগাম কোনো সতর্কবার্তা ছিল কি না এবং সে অনুযায়ী অধিদপ্তরের কী ধরনের কার্যক্রম ছিলÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তিনি মাত্র আগের দিন (বুধবার) দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার কাছে নেই।
অন্যদিকে হাওরে অতিভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসলহানির আগে কী ধরনের সতর্কতা বা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল জানতে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ মাহে আলমকে মোবাইলে ফোন দিলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।
কৃষিমন্ত্রীর কৃষি-সংক্রান্ত দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন
কিছু কৃষি অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষিমন্ত্রীর কৃষি-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও নীতিনির্ধারণী প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের মতে, অতীতে বিভিন্ন সরকার কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দলীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের হাতে দিয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তারা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও ড. আব্দুর রাজ্জাক এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর নাম উল্লেখ করেন।
তাদের মতে, এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতো।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা অভিযোগ করেন, এবার কৃষি মন্ত্রণালয় এমন ব্যক্তির হাতে দেওয়া হয়েছে, যার কৃষি খাতে অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে কৃষিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিমত।
এর প্রভাব হিসেবে দেশের অন্যতম প্রধান বোরো উৎপাদন এলাকা হাওরের ফসলহানি ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।
শুধু হাওর নয়, বিভিন্ন জেলায়ও বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তারা আরও বলেন, অতীতের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কৃষি উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
তাদের অভিযোগ, তখন কৃষি খাতে প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
তাদের মতে, শুধু উৎপাদন ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়; বরং কৃষিকে আধুনিকায়ন ও রপ্তানিমুখী করার জন্য বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।