ফারুক আহমাদ আরিফ, ঢাকা ও সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ১২:৫৪ পিএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৬ ১৭:০৬ পিএম
অতি বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় পানিতে তলিয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমির বোরো ধান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গত ২৬ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর তথা কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৪৪ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩৭ কোটি টাকা। ফসল হারিয়ে কৃষকরা দিশেহারা। অনেকের ধান পানিতে তলিয়ে যায়। কেউ কেউ সেসব ধান কাটতে পারলেও রোদের অভাবে তাতে চারা গজিয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে ৭ হাজার হেক্টরের ফসল |
কিশোরগঞ্জে ক্ষতি ২৫৯ কোটি টাকা
উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ ১৩টি উপজেলায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই জেলায়, যার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা।
তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য কৃষি বিভাগের জরিপে উঠে আসেনি বলে দাবি অনেক কৃষকের।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে জেলার ১৩টি উপজেলায় ১১ হাজার ১৭৪ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৯ হাজার ৭১৫ জন কৃষক এবং ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হাওরাঞ্চলে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন হাওরে পানি আসার সময়। তবে এবার বন্যা না হয়েও বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে গেছে ধানের জমি। অবশ্য ঢলের পানি হাওরে তেমনভাবে আসেনি। এবার ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকেরা হার্ভেস্টার দিয়ে সহজে ধান কাটতে পারেননি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের জরিপে মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি উঠে আসেনি। অনেক এলাকায় শতভাগ ফসল তলিয়ে গেলেও সরকারি তালিকায় তার প্রতিফলন নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা ও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন জেলার ভুক্তভোগী কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, জমিতে ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত যে টাকা খরচ হয়, ধান বিক্রি করে তা পোষায় না। বর্তমানে অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছে, যা বাঁচানো গেছে, তা-ও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সেই ধান তারা বিক্রি করছেন মাত্র ৬৫০ টাকা মণ দরে। উৎপাদন খরচ বাদ দিলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
ব্যবসায়ীরা জানান, ভেজা ধান কেনার পর তাদের শুকাতে হচ্ছে। তাই বর্তমানে ধানের দাম কম। হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থা একই।
জেলা সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, “কৃষকরা যাতে সহজে সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন সেজন্য উপজেলায় উপজেলায় মাইকিংসহ সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৫ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ধান সংগ্রহ কার্যক্রম এগিয়ে ৩ মে থেকেই শুরু করা হয়েছে।”
পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধান গুদামে দিতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।”
গতকাল বুধবার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, মাঠপর্যায়ের গত ৪ মের তালিকা অনুযায়ী জেলায় মোট ১১ হাজার ১৭৪ হেক্টর জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৯ হাজার ৭১৫ জন কৃষক। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, আরও দেড় হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।
সুনামগঞ্জে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি
সুনামগঞ্জে টানা তিন দিন ধরে রোদ থাকলেও কৃষকদের ভোগান্তি কোনো অংশেই কমেনি। জেলার বোরো মৌসুমে পাকা ও আধাপাকা ধান কাটা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ধান কাটার পর শুকানোর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কেউ সড়কে, আবার কেউ ছোট মাড়াই খোলায় ধান শুকাতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমিক সংকটের কারণে অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত শ্রমিক।
চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত জেলায় ৭২ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে বৈরি আবহাওয়ায় ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলায় জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর। চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির ধান।
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলায় এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার ৯১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রাথমিক হিসাবে জেলায় ১৯৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) বিএম মুশফিকুর রহমান বলেন, বুধবার পর্যন্ত জেলায় ৩৬ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। জেলায় ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান সরাসরি কৃষকদের কাছে সংগ্রহ করা হবে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, জেলায় এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। তবে চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির ধান।
তিনি আরও বলেন, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ৫০ হাজার ৯১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জেলায় ১৯৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, সিলেটে ৮৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। সেখানে বৃষ্টি ও ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৯২ হেক্টর জমির ফসল। এতে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণ দিতে কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মৌলভীবাজারে ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হবিগঞ্জের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, হবিগঞ্জে এ বছর ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৯ হেক্টর জমির ফসল। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২১০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ২৩ হাজার ৯০৪ জন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, জেলায় ৯৩৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাতে ৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৫ জন।
(প্রতিবেদন তৈরিতে যুক্ত ছিলেন সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চলীয় অফিস এবং তানভীর আহমেদ, সুনামগঞ্জ)