ডিসিদের প্রতি বার্তা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ০৮:৫৭ এএম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
আত্মসমালোচনার পাশাপাশি নতুন প্রত্যাশা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে শেষ হলো চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন ২০২৬। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনটি ছিল নতুন সরকারের অধীনে প্রথম বড় প্রশাসনিক সমন্বয় সভা। যেখানে মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে সরকারপ্রধান তারেক রহমানের সামনেই খোলামেলা আলোচনা করেছেন। গত রবিবার শুরু হয়ে গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে ৩০টি ছিল কার্য-অধিবেশন। এতে ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মাঠ প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবের মধ্য থেকে বাছাই করা ৪৯৮টি প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই সম্মেলনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে মাঠ প্রশাসনে নির্ভয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ডিসিদের। পাশাপাশি বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়াসহ নতুন সরকারের একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্পর্কিত বার্তা দেওয়া হয়েছে তাদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মেলন শেষে একটি বিষয় স্পষ্টÑ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার দায় নিতে অনাগ্রহী। পাশপাশি তারা একটি জবাবদিহিতামূলক, নিরপেক্ষ ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসন গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ডিসি সম্মেলনের শেষ দিনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অতীতের বিতর্ক, বর্তমানের অস্বীকৃতি
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ ছিলÑ মাঠ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বিশেষ করে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং রিটার্নিং কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কাজ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনে ডিসিরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন কর্ম অধিবেশনে মন্ত্রীদের জানিয়ে দিয়েছেন, তারা আর কোনোভাবেই ‘দলীয় হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে চান না। অতীতের প্রশাসনিক অপকর্মের দায় নিজেদের ওপর নিতে তারা প্রস্তুত নন। বরং তারা নিজেদের পেশাগত সততা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
কয়েকজন ডিসি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, অতীতে রাজনৈতিক চাপ, বদলির ভয় এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তারা ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্ত থাকতে চান।
প্রধানমন্ত্রীর বার্তাÑ সততা ও পেশাদারত্বই মূলনীতি
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরির প্রতিটি পদই গুরুত্বপূর্ণ এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে আপস করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর। তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধুমাত্র পদোন্নতি বা পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য কাজ করলে তা সাময়িক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নষ্ট করে। তার মতে, সততা, মেধা এবং দক্ষতাই হতে হবে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির একমাত্র মানদণ্ড। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একটি শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রশাসনের দাবি
সম্মেলনের অনির্ধারিত আলোচনায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি। যদিও আনুষ্ঠানিক আলোচনায় এটি সরাসরি প্রাধান্য পায়নি, তবে বিভিন্ন পর্যায়ে ডিসিরা প্রশাসনিক কাজে স্বাধীনতা চেয়েছেন। অতীতে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, হুমকি এবং বদলির চাপের অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ডিসিরা এমন একটি পরিবেশ চানÑ যেখানে তারা আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে নির্ভয়ে কাজ করতে পারবেন। সরকারও এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তা যেন দলীয় আনুগত্যের কারণে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হন।
আইনশৃঙ্খলা, অস্ত্র ও ভুয়া মামলা নিয়ে কঠোর অবস্থান : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত অধিবেশনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ভুয়া মামলা প্রত্যাহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কর্মঅধিবেশন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, প্রায় ১০ হাজার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। অতীতে দায়ের হওয়া ‘গায়েবি’ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো যাচাই করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এসব মামলা যাচাই করবে এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির সুপারিশ করবে। এতে সাধারণ মানুষ এবং সাংবাদিকদের অযথা হয়রানি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিসিদের একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সড়ক ও রেলপথের পাশে পশুর হাট বসানো যাবে না, বড় হাটগুলোতে জালনোট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং পুলিশকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে রাখা হবে। এ ছাড়া মহাসড়কে সিসিটিভি নজরদারি, ফেরিঘাটে নিরাপত্তা জোরদার এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চামড়া শিল্প রক্ষায় উপজেলা পর্যায়ে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা চেয়েছে দুদক
সম্মেলনে দুর্নীতি প্রতিরোধে ডিসিদের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘সততা স্টোর’ কার্যক্রমকে কার্যকর করতে ডিসিদের তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা ঠেকাতে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুদকের হটলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও তুলে ধরা হয়।
সাংবাদিকতার নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত অধিবেশনে সাংবাদিকতার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, ডিজিটাল মিডিয়ার প্রসারের ফলে অনেকেই সহজে সংবাদ মাধ্যম চালু করছেন, কিন্তু এর জন্য কোনো সমন্বিত নীতিমালা নেই। ফলে মাঠ প্রশাসনের কাজে কখনও কখনও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের জন্য একটি কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন সরকারের প্রথম সম্মেলনের তাৎপর্য
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রায় দেড় বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের অধীনে এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন। মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে নতুন সরকারের আমলে হওয়া ডিসি সম্মেলনকে অনেকেই প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন এবং জনসেবা বৃদ্ধির জন্য সকলকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের উদ্দেশে বলেছেন, জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবায় আপনাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ভালো মানসিকতা নিয়ে ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির জন্য ভালো কিছু করতে হবে।
সরকারের একাধিক মন্ত্রীও বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের নিপীড়নে কাজে লাগিয়েছে জেলা প্রশাসকদের। নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার জন্য তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আগামী দিনে দলীয় আনুগত্যে জনগণের নিপীড়নের কাজে ব্যবহৃত না হতে ডিসিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। চার দিনব্যাপী সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মঅধিবেশনে ডিসিরাও মাঠ প্রশাসনে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তাদের কর্তৃত্ব বাড়ানো, বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ যৌক্তিক কিছু প্রস্তাবনা লিখিতভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে সরকারপ্রধানের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।
সম্মেলন শেষে গতকাল সন্ধ্যা ৭টার পর রাজধানীর আগারগাঁয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বাসা) বার্ষিক সম্মেলন ও নৈশভোজ আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তারেক রহমান। বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা নৈশভোজে অংশ নেন।
এবারের ডিসি সম্মেলন প্রসঙ্গে একাধিক জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, এই সম্মেলন মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে পারে। তবে বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ওপর যে রাজনৈতিক প্রভাব ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যেও পেশাগত সততা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অতীতের বিতর্ক পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করতে চায় মাঠ প্রশাসনÑ ডিসি সম্মেলন ২০২৬ এই বার্তাই দিয়েছে। ডিসিরা জনগণের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তুলতে চান। সরকারের নীতিগত সমর্থন, প্রশাসনের আত্মপ্রতিশ্রুতি এবং জনগণের প্রত্যাশাÑ এই তিনের সমন্বয় ঘটলে আগামী দিনে একটি জবাবদিহিতামূলক ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবে রূপ পায়।