মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১৯:৪৬ পিএম
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক যেন এখন এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। ডাম্পার, মিনি কার, পিকআপ, সিএনজি অটোরিকশা এবং ফিটনেসবিহীন পর্যটকবাহী ‘চান্দের গাড়ি’—সব মিলিয়ে এই সড়কে চলছে চরম অরাজকতা। যাত্রীসেবার নামে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা যেন সীমাবদ্ধ কেবল মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ও কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যেই। অবৈধ মিনি কার, বালুবাহী ডাম্পার ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এই রুটকে ‘মরণফাঁদে’ পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রাণহানি ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সর্বশেষ ট্র্যাজেডি
সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরাও এখন আর নিরাপদ নন। মঙ্গলবার কোটবাজার এলাকায় গভীর রাতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মোহাম্মদ রবিউল (২২)। তিনি মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর হংসমিয়াজীর পাড়া এলাকার মোক্তার হোছাইনের একমাত্র পুত্র।
ডিভাইডার স্থাপনের কাজ করার সময় একটি বেপরোয়া গতির পিকআপ তাকে সজোরে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তার পরিবার এখন দিশেহারা।
গত ১৯ এপ্রিল সকালে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বড় ডেইল এলাকায় ৪ যাত্রীসহ একটি মিনি কারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলিন্ডার থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো গাড়িটি পুড়ে যায়।
২৩ এপ্রিল বাহারছড়া এলাকায় ডাম্পার ট্রাকের ধাক্কায় এক মোটরসাইকেল আরোহী পর্যটক নিহত হন।
সড়কের তিন ‘ত্রাস’: মিনি কার, ডাম্পার ও চান্দের গাড়ি
‘অবৈধ’ যানবাহনে মাসোহারা বাণিজ্য: এই রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ মিনি কারের যাত্রী পরিবহনের বৈধ অনুমতি নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব গাড়ি থেকে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা মাসোহারা আদায় করা হয়। এর ফলে লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন নির্বিঘ্নে সড়কে চলাচল করছে।
ডাম্পার ও পিকআপের দৌরাত্ম্য:বালুবাহী ডাম্পার ও দ্রুতগতির পিকআপ এখন সড়কের বড় হুমকি। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের হাতে এসব ভারী যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
চান্দের গাড়ির ঝুঁকি:ফিটনেসবিহীন পর্যটকবাহী ‘চান্দের গাড়ি’ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কয়েকগুণ। নিরাপত্তাহীন এসব যানবাহনে ভর করে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন অসংখ্য মানুষ।
ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা: নিরাপত্তা না কি চাঁদাবাজি?
সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের তৎপরতা সীমাবদ্ধ মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে অভিযানেই। অথচ পাশ দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলা ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
নির্দিষ্ট পয়েন্টে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
টেকনাফ বাস স্টেশনের ঝর্ণা চত্বরে পুলিশ বক্সে সাধারণত কাউকে দেখা না গেলেও, ট্রাক আসার সময় সেখানে ট্রাফিক সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাঁশ ভর্তি প্রতিটি ট্রাক থেকে ৫০০ টাকা এবং নাফ পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়ানো প্রতিটি চান্দের গাড়ি থেকে মাসিক ১০০০ টাকা করে আদায় করা হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, আর কত প্রাণহানি ঘটলে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ হবে? অবিলম্বে বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, বর্তমানে টেকনাফ-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। যেসব যানবাহন বেপরোয়া চলাচল করছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যদি আমার ইউনিটের কোনো পুলিশ সদস্য চাঁদাবাজি বা হয়রানির সঙ্গে জড়িত থাকে এবং এ বিষয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।