ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
দীপক দেব
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১২:৩৮ পিএম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬ ১২:৪৭ পিএম
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে এবং তা আরও ইতিবাচক হবে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে আগ্রহের জায়গা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। সোমবারের নির্বাচনে অবসান ঘটেছে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে এবং তা আরও ইতিবাচক হবে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতার পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ঢাকা-দিল্লি টানাপড়েন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আস্তে আস্তে সম্পর্কে স্বস্তি ফেরার মধ্যেই নতুন সমীকরণের প্রত্যাশা তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ঘিরে।
বিশেষ করে কেন্দ্রে বিজেপি শাসনের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির বিজয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে কারণে সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারেÑ তা নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে নানান বিশ্লেষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের পর শুরু হওয়া টানাপড়েন অবস্থা থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারত সরকারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্নতি ঘটতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতা বিজেপির সদ্য বিজয়ী পশ্চিমবঙ্গ সরকারও রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ দুই দেশের ইতিবাচক সম্পর্কের সঙ্গে এই অঞ্চলের শান্তি শৃঙ্খলা স্থিতিশীলতা এমনকি অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিজেপি এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই তাদের পদক্ষেপ নেবে বলেও মনে করা হচ্ছে। কারণ দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করার মধ্য দিয়ে সমতাভিত্তিক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কেন্দ্র ও রাজ্যে পৃথক সরকার থাকায় যা আগে কখনও কখনও বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। এত দিন তিস্তা চুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিকে কেন্দ্র করে যে জটিলতা ছিল, এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, পুশব্যাক, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিÑ এসব ইস্যুতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের বড় পরাজয়ে বিজেপির আশা পূর্ণ হয়েছে। আর নিজের আসন ভবানীপুরে হেরে মমতা হয়ে পড়েছেন কোণঠাসা। যিনি ২০১১ সালে শেষ মহূর্তে আটকে দিয়েছিলেন বহুল আলোচিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি।
তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে একটি অংশ হিসেবে দেখছেন সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকা দিল্লি সম্পর্ক হচ্ছে কেন্দ্রের সঙ্গে। এখানে পশ্চিবঙ্গের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা মুখ্য নয়, গৌণ। তবে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক একাধিক পক্ষ থেকে নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখা হয়, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। তবে আমি মনে করি, রাজনৈতিকভাবে যত বক্তব্যই থাকুক না কেন। সরকার পরিচালনার জন্য স্থিতিশীলতা, অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রেখে তারা পদক্ষেপ নেবেন। তাদের একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, সেখানে জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাব এখানেও পড়বে। সুতরাং বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চয় চাইবে না সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা অব্যাহত, সেখানে নতুন করে কোনো জটিলতা তৈরি হোক। তিস্তা ইস্যুতে সতর্কভাবে আশাবাদী হবÑ এমন মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব রাজনীতি আছে, তারা কি কেন্দ্রের জন্য সেই স্বকীয়তা বাদ দিতে পারবে? এই ইস্যুতে এখনই অবস্থার পরিবর্তনের মতো আশাবাদ ব্যক্ত করার কিছু দেখি না। তবে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে আমি আশাবাদী।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ে তিস্তা নিয়ে কিছুটা হলেও আশা দেখছেন আরেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গতবার তৃণমূলের বিরোধিতার মুখে তিস্তা চুক্তি বাতিল হয়ে যায়, এবার বিজেপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও দূর হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। দুই দেশের জন্য এই চুক্তি কেন জরুরি, সেই বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে আনতে হবে, যেন ভারতের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলার কোনো সুযোগ না পায়। এ ছাড়া সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আগামী কয়েক মাস দুই দেশের পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমেই বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সম্পর্ক ইতিবাচক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুই পক্ষ থেকেই প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। হয়তো আগামীতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সফরও হতে পারে। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই সম্পর্কের মাত্রাটা বোঝা যাবে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় তিস্তা চুক্তির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঐতিহাসিক হলেও আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক যোগাযোগ আগের মতোই কেন্দ্রের সঙ্গে থাকবে। যেহেতু বর্তমানে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল (বিজেপি) ক্ষমতায় এবং তারা বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তাই সরকার গঠনের সময় তারা কৌশলগত এই স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রাখবে বলে মনে হয়।
সরকারের দায়িত্বশীলরা মনে করছেন প্রভাব পড়বে না
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের পর ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ের অনেকেই মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও প্রতিমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পর্যায় থেকে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বদল আসবে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হবে না।
তিস্তা ইস্যুতে দিল্লির জন্য অপেক্ষায় থাকতে চায় না ঢাকা
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে যখন ঘুরে ফিরেই তিস্তার বিষয়টি সামনে আসছে, ঠিক সেই সময় গতকাল মঙ্গলবার বেইজিং সফরের প্রাক্কালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, এই সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা হবে। তিস্তাপাড়ের মানুষের ‘বাঁচা-মরার’ প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তির জন্য অপেক্ষায় থাকতে চায় না বাংলাদেশ সরকার, বরং এই প্রান্তের উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে চীনের সঙ্গে আলোচনা চালাতে আগ্রহী আমরা।