তোফাজ্জল হোসেন কামাল
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১১:৫১ এএম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬ ১২:৫১ পিএম
ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আগামী ১০ মে সকালে পুলিশ সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিদেশের বাংলাদেশ মিশন-দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগসহ ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় পুলিশ অফিসারদের নিয়োগসহ ৬ দফা দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির হচ্ছে পুলিশ।
পদায়নের জন্য পুলিশের পছন্দের এ ৬টি সংস্থার মধ্যে রয়েছেÑ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বিআইডব্লিউটিএ।
চার দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ প্যারেডে এসব দাবি তুলে ধরা হবে। আগামী ১০ মে থেকে ১৩ মে পর্যন্ত চলবে এ পুলিশ সপ্তাহ। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানসূচিতে ব্যাপক কাটছাঁট করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আগামী ১০ মে সকালে পুলিশ সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবারের পুলিশ সপ্তাহের প্রতিপাদ্যÑ ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মাধ্যমে এ সপ্তাহের কার্যক্রম শুরু হবে। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী অসমসাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ কাজ, গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের জন্য ১০৭ পুলিশ সদস্যকে চার ক্যাটাগরিতে বিপিএম ও পিপিএম পদক প্রদান করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির স্টল পরিদর্শনের পর পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে কল্যাণ প্যারেডে উপস্থিত থাকবেন। এই প্যারেডের সময়েই পুলিশের পক্ষ থেকে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হবে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ প্রথমত. দেশের সর্বত্র সাইবার সুরক্ষা জোরদার করা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পুলিশে সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রতিষ্ঠা; দ্বিতীয়ত. কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে একটি পুলিশ মেডিকেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা; তৃতীয়ত. পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে সিলেট এবং বরিশাল বিভাগে দুটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) এবং চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন; চতুর্থত. পুলিশ সদস্যদের সুস্থ দেহ, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ক্রীড়া সক্ষমতার মান আরও বাড়াতে স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ; পঞ্চমত. প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, বিদেশে মানব পাচার, নির্যাতন ও বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ করতে, একই সঙ্গে দেশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ব্যবস্থাপনা আরও উন্নীতকরণসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মিশন-দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগসহ দুদক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ইত্যাদিতে পুলিশ অফিসারদের পদায়ন; ষষ্ঠত. সাধারণ পুলিশিংয়ের পাশাপাশি দেশে উগ্রবাদ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত গমনাগমনের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি এভিয়েশন পুলিশ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা।
গত বছরের সাত দাবির একটিও পূরণ হয়নি
এক বছর আগে তৎকালীন সরকারের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরেছিল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫ উপলক্ষে উত্থাপিত এসব দাবির একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে ওই দাবিগুলো পাঠায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পুলিশ পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার স্বাক্ষরিত দাবিগুলোর মধ্যে ছিলÑ বাহিনীর সদস্যদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন বা বিকল্পভাবে ওভারটাইম ভাতা প্রদান, একই সঙ্গে আইজিপি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সবার জন্য ঝুঁকি ভাতা চালু, সরকারের অন্যান্য দপ্তরের মতো পুলিশের ইন্সপেক্টর পদে ৯ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির সুযোগ থাকা, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার রাখতে একটি স্বায়ত্তশাসিত ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার জন্য উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) আওতায় আনা, কনস্টেবল ও এসআইদের প্রশিক্ষণকালীন বেতন-ভাতা দেওয়া, কনস্টেবল থেকে নায়েক/এএসআই (নিরস্ত্র)/এটিএসআই, নায়েক থেকে এএসআই (সশস্ত্র), এএসআই (সশস্ত্র) থেকে এসআই (সশস্ত্র), এটিএসআই থেকে টিএসআই এবং এএসআই (নিরস্ত্র) থেকে এসআই (নিরস্ত্র) পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পুনরায় পরীক্ষার নিয়ম বাতিল, অযৌক্তিক কারণে চাকরিচ্যুত বা পদোন্নতিবঞ্চিতদের বিষয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে যাচাই-বাছাই শেষে পুনর্বহাল ও প্রাপ্য সুবিধা দেওয়া, বিভাগীয় মামলার তদন্ত তিন মাসের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা নেওয়া, এ ছাড়া পুলিশের অভ্যন্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, প্রশাসনিক ও নীতিগত কারণে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ধাপে ধাপে হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাঠামোগত সংস্কার এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া অপরিহার্য।
পুলিশ সপ্তাহের বাজেটে কাটছাঁট
জ্বালানি ও আর্থিক খরচসহ সার্বিক পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এবার শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় বার্ষিক ইভেন্ট পুলিশ সপ্তাহ। সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে এবারের আয়োজনে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। সাত দিনের বদলে অনুষ্ঠান সীমিত করা হয়েছে চার দিনে, কমানো হয়েছে ইভেন্ট ও অতিথি সংখ্যা। সরকারের পরিচালন ব্যয় হ্রাসের বিষয়ে গত ৯ এপ্রিল ৯ দফা নির্দেশনা দিয়ে পরিপত্র জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাদ পড়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পুলিশের সম্মিলন অনুষ্ঠানটি এবারও হচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি চিকিৎসার জন্য ৯ মে লন্ডন যাবেন। এ কারণে তার সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের রেওয়াজ অনুযায়ী সাক্ষাৎ ঘটছে না। এ ছাড়া পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পরবর্তী ভাষণ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হলেও শেষ সময়ে এসে সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে পুলিশের কল্যাণ প্যারেডে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে শাপলা হলের অনুষ্ঠান বাদ পড়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই নির্দেশনার আলোকেই পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠান কাটছাঁট করা হয়েছে। এবার নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হচ্ছে না। প্যারেডে অংশ নেওয়া পদকপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (অতিরিক্ত এসপি) নিচের পদমর্যাদার কাউকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পুলিশ সপ্তাহ উদ্যাপন কমিটির এক কর্মকর্তা। অন্যান্য বছরের ন্যায় এ বছরও পুলিশ সদস্যসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য নিয়ে বার্ষিক পিকনিক হচ্ছে না। সূত্রমতে, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সংখ্যা কমাতে এ বছর অনেক কর্মসূচিই বাদ দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানিকতায় যা যা থাকছে
চার দিনের আয়োজনে পুনাক বার্ষিক সমাবেশ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন, আইজিপি সম্মেলন, শিল্ড প্যারেড এবং আইজিজ ব্যাজ প্রদান অনুষ্ঠিত হবে। এসবি, সিআইডি ও পিবিআইয়ের প্রেজেন্টেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সঙ্গে সম্মেলন, অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্মিলনী হচ্ছে এবার। এবারের পুলিশ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা করে সম্মিলন হবে, যেখানে সিলেকটিভ পুলিশ কর্মকর্তারা নির্ধারিত বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানা গেছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশের বার্ষিক কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। এতে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ক বৃদ্ধিসহ সেবার মান নিশ্চিতে নানা ধরনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।