আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১০:১০ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কানের প্রণীত নকশা অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কানের প্রণীত নকশা অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আর এ কারণেই বর্তমানে তোপখানা রোড ও আব্দুল গনি রোডের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয়ের অভ্যন্তরে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ না করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গণপূর্ত অধিদপ্তর নতুন সচিবালয় নির্মাণ সম্পর্কিত বিষয়গুলোর খোঁজখবর নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী।
তিনি বলেন, সচিবালয়ের ২১ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি একনেক বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি।
গত ২৬ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলাবিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণকাজের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতেই প্রকল্পটি অনুমোদন না করে সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে (শেরেবাংলা নগর) সচিবালয় নির্মাণ করা যায় কি না তা ভেবে দেখার জন্য বলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কারণে ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যায়ের প্রকল্পটি একনেক থেকে ফেরত আসে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রাণকেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নতুন এ ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারি অর্থায়নে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল, যা আপাতত হচ্ছে না। সচিবালয় প্রাঙ্গণে অধিকসংখ্যক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের স্থান দেওয়া, জমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও সরকারি অর্থের সুষ্ঠু উপযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।
২১ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে বলা হয়েছিল, এতে চারটি বেজমেন্টসহ একটি ফাউন্ডেশন, সুপার স্ট্রাকচার, অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতায়ন ও গ্যাস সংযোগের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সেই সঙ্গে ২ হাজার কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি সাবস্টেশন, ৫০০ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি এবং ৪০০ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি জেনারেটর স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছিল। ছয় সেট প্যাসেঞ্জার লিফট, ছয় সেট ফায়ার লিফট ও দুই সেট বেড লিফটসহ অগ্নিনিরাপত্তা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং মাল্টিমিডিয়াসহ কনফারেন্স সিস্টেমও ছিল প্রকল্পভুক্ত। এর সঙ্গে ২০টি আধুনিক কনফারেন্স রুম হওয়ার কথা ছিল।
পরিকল্পনা বিভাগ বলছে, সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়। অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সচিবালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক বাস্তবায়িত হয়। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বহুলাংশে এবং সামগ্রিকভাবে সেবা বৃদ্ধি পাওয়ায় কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, বিদেশি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাসহ সাধারণ জনগণ নিজ নিজ প্রয়োজনে এখানে আসেন।
সচিবালয়ে বিদ্যমান স্থাপনাগুলো ক্রমবর্ধমান ব্যবহারকারীর চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে না। প্রস্তাবিত ভবনটি নির্মিত হলে সচিবালয়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুট জায়গা পাওয়া যাবে, যাতে অতিরিক্ত চাহিদার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ পূরণ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে পরিকল্পনা বিভাগ।
বৈঠকে উপস্থিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রকল্পটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন নয়। তবে শেরেবাংলা নগরে এতদিন যেখানে বাণিজ্য মেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল সে জায়গায় সচিবালয় নির্মাণের একটি পুরোনো সিদ্ধান্ত ছিল। শেরেবাংলা নগরের মাস্টারপ্ল্যানেও এখানে সচিবালয় নির্মাণের কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রী সেদিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরাও তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি।
হচ্ছে না প্রশাসনিক রাজধানী
বিগত বছরগুলোতে পূর্বাচল উপশহরে মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার আদলে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথমদিকে এই আলোচনা জোরালো থাকলেও পরে পূর্বাচল উপশহরে সচিবালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত জমি অন্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানেই প্রথম ধাক্কা খায় নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর পরিকল্পনা। লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী শেরেবাংলা নগরের যে স্থানটিতে নতুন সচিবালয় হওয়ার কথা ছিল তার পাশেই ছিল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। আর এ কারণেই তৎকালীন সরকার প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ইস্যুতে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পথে হাঁটেনি। উপরন্তু সেখানে প্রতিবছর মাসব্যাপী যে বাণিজ্য মেলা হতো তা-ও সরিয়ে নেওয়া হয় পূর্বাচলে।
সূত্র মতে, এ কারণেই সচিবালয়ের অভ্যন্তরে একাধিক নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছিল বিগত সরকার। সর্বশেষ একনেক থেকে ফেরত আসা প্রকল্পটিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরনো পথে না হেঁটে নতুন সচিবালয় নির্মাণের যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন তা বাস্তবায়িত হলে শেরেবাংলা নগর ঘিরে প্রশাসনিক রাজধানীর যে ধারণা ছিল তা বাস্তব রূপ পাবে। বর্তমানে শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁও অংশে অনেকগুলো মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভাগ, দপ্তর-অধিদপ্তরের অফিস বাস্তবরূপ পাওয়ায় ওই এলাকার সার্বিক চেহারাই পাল্টে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সংসদ ভবন ও আগারগাঁওয়ের মধ্যবর্তী স্থানে নতুন সচিবালয় নির্মাণ হলে পুরো শেরেবাংলা নগর প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।