সাক্ষাৎকারে কেনেথ রগফ
জাহাঙ্গীর সুর
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬ ১০:২৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগফ। ফাইল ছবি
ইরান যুদ্ধের প্রভাব সর্বময়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। যুদ্ধের আঁচ পড়েছে এ দেশের নানা ক্ষেত্রে। বিশেষত জ্বালানি খাতে। মুখ থুবড়ে পড়ার মুখে স্বয়ং মার্কিন আধিপত্যও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নিজের শর্তে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তা হলে এটা হবে তার বড় পরাজয়। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকার এমন মূল্যায়ন করেছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগফ। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এই অধ্যাপক এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তার সঙ্গে ইমেইলে আলাপ করেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর জাহাঙ্গীর সুর।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকা এবং এর ফলে সৃষ্ট এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে আগামী বছরগুলোয় কী ধরনের কাঠামোগত প্রভাব পড়তে পারে?
কেনেথ রগফ: ইরান যুদ্ধ, হামলায় কাতারের এলএনজি অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী আংশিক অবরোধ আগামী বেশ কয়েক বছর এলএনজির বাজারকে প্রভাবিত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়বে এবং এশিয়ার কিছু দেশের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সরকারকে যে বিপুল ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, তা এই দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করবে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অর্থায়ন করা এখন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাপী সারের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঘটছে, এর কারণে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশগত ক্ষতি রোধ করতে সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে?
কেনেথ রগফ: এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার জন্য সরকারকে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সাময়িকভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য খাদ্য ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অন্যান্য উৎস থেকে সার সংগ্রহ নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করতে হবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: দীর্ঘমেয়াদি এই অস্থিরতা গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানমূলক সম্পর্ককে কীভাবে স্থায়ী রূপ দেবে বা পাল্টে দেবে?
কেনেথ রগফ: ইরান যুদ্ধের আগে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় সাফল্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিল। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারাই প্রথম দেশ, যারা ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’ থেকে বেরিয়ে আসার পথে হাঁটছিল। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়া ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে লাখো প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ। একই সময়ে, ইউরোপ ও এশিয়ার জন্য জ্বালানির স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হয়ে উঠেছিল মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধ এই গল্পের ইতি টেনেছে, তা বলব না; তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যুদ্ধ ব্যাঘাত ঘটিয়েছে, বিশেষ করে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আবার যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে যায়নি। যদিও তারা যাদের ওপর নির্ভরশীল, সেই বিদেশি কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে ধরে রাখতে তাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সুতরাং এই যুদ্ধ যতক্ষণ না পুরো অঞ্চলজুড়ে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিচ্ছে, সৌভাগ্যবশত রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এখনও বড় পরিসরে পারস্পরিক লাভজনক বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও যুদ্ধের কারণে ঝুঁকি বেড়েছে, তবে তা এই সম্পর্ককে পুরোপুরি বদলে দেবে বা শেষ করে দেবে বলে আমার মনে হয় না।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো হয়তো যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনকে আরও বেশি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করেছে। এই পালাবদলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিণতি কী হতে পারে?
কেনেথ রগফ: [মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের] শুল্কযুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধ নিশ্চিতভাবেই চীনের অনুকূলে বড় ধরনের বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। এ রকম পরিস্থিতিতে, ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা অসহায় বোধ করছে। তারা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খুঁজছে। তবে এই পালাবদলের অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধের ফলাফলের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের কট্টরপন্থীদের লাগাম টেনে ধরতে সফল হয় এবং এমন একটি পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, যা ইরানকে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে নিয়ে আসবে, তবে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে সমীহ ও ভয়ের নাম হয়ে উঠবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে আরও সুসংহত করবে এবং ‘ডি-ডলারাইজেশন’ তথা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতাকে এমনকি উল্টেও দিতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প যদি এমন কোনো নখদন্তহীন চুক্তিতে রাজি হন, যা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অক্ষুণ্ন রাখে (হয়তো তেহরান ইউরেনিয়ামের বদলে প্লুটোনিয়াম বোমা তৈরির কথা ভাবতে পারে) এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে হুমকি দেওয়া থেকে যদি কোনো কিছুই বিরত রাখতে না পারে, তবে তা রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এবং ব্যক্তিগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এই পরিস্থিতি চীনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং এমন বিশ্ব এমন দিকে বড় মোড় নেবে, যেখানে ডলারের একক আধিপত্য অনেকটাই কমে আসবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: আমাদের সঙ্গে অমূল্য সময় ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কেনেথ রগফ: আপনাকেও ধন্যবাদ।