× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অবহেলায় ডুবল হাওরের ফসল

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাওরের পাকা ধান ডুবছে পানিতে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাওরের পাকা ধান ডুবছে পানিতে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরসহ দেশের হাওরাঞ্চলে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারেÑ গত ২৪ এপ্রিল থেকে এমন পূর্বাভাস দিচ্ছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। কিন্তু প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেই পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেননি। ফলে বিস্তৃত হাওরাঞ্চলের জমির ফসল বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ডুবে গেছে।

এ ঘটনার আগে থেকেই কৃষকরা ডিজেল সংকটের কারণে জমিতে সেচ দিতে পারছিলেন না। হাওরে ধান কাটার ব্যাপারে প্রতি বছরের মতো চলতি বছরেও কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ ধান উৎপাদনক্ষম অঞ্চল হাওরের ফসল ডুবে গেছে। 

পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করেছেন, এ সময় জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলছিল। কিন্তু সেখানেও এ ব্যাপারে জোরালো কোনো আলোচনা হয়নি। উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়নি। অবশ্য অধিবেশনের শেষ দিন প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের ৩ মাসের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওরে ফসলের এ বিপর্যয় এলে সরকারের একধরনের অবহেলার খেসারত। 

পানির নিচে ২৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে, গত বুধবার পর্যন্ত হাওরে ৬৩.৯১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ২০১ হেক্টর জমির ধান। এ সময় সারা দেশে ধান কাটা হয়েছে ১৩.৬২ শতাংশ। 

এদিকে গতকাল শনিবার সকালে বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বোয়ালা হাওরের অন্তত ২০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সোমেশ্বরী নদীর পানি বেড়ে গিয়ে মধ্যনগর জামে মসজিদের পাশের কালভার্টের সামনের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে হাওরে প্রবেশ করে। এতে তলিয়ে যায় ফসলি জমির ধান। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, এই বাঁধ নির্মাণের কাজে অনিয়ম করা হয়েছে। কালভার্টের মুখের এই বাঁধে আড়-প্যালাসেটিং কিছুই দেওয়া ছিল না। যে কারণে এই বাঁধটি পানির চাপে ভেঙে গেছে।

মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, “এই হাওরে বেশকিছু জমির ধান সপ্তাহখানেক আগেই জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে কোনো জমি তলিয়ে যায়নি।”

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “হাওরে ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে, এমন সময় বাঁধও ভেঙেছে। সেজন্য বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়নি। এর আগে গত শুক্রবার বাঁধ ভেঙে এই উপজেলার শালদিঘা হাওরে পানি ঢুকছিল। দিনভর চেষ্টার পর ভাঙনের অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ আটকানো হয়Ñ যার কারণে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।”

গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের চাপে গত বৃহস্পতিবার সকালে বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পানি ঢুকে জিনারিয়া হাওরের ৩ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে যায়। ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনে দেশের আটটি বিভাগে বৃষ্টি হয়েছে ৪ হাজার ৬৯০ মিলিমিটার। এই বৃষ্টিপাত ত্বরান্বিত করেছে এ বিপর্যয়। এ ব্যাপারে রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “চলতি বছর বন্যা একটু তাড়াতাড়ি এসেছে। আর জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষকরা কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনগুলো ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেনি। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের কারণে ধান কাটা ও মাড়াই দেরি হয়েছে। কৃষিকাজে জ্বালানি যাতে পর্যাপ্ত থাকে, সরকারের উচিত ছিল সেই ব্যবস্থা করা। সরকারের আগের বছরগুলোর স্টাডিগুলোকে যদি নীতিনির্ধারকরা গুরুত্ব দিতেন, তাহলে তাদের দেখার দরকার ছিল বাঁধগুলো ঠিক আছে কি না, ঠিকমতো হয়েছে কি না। আর মাটি দূর থেকে আনছে কি না। আর যেহেতু ধান কাটা ও মাড়াই মেশিনে হচ্ছে তাই জ্বালানি ঠিক আছে কি না। বাস্তবে সেরকম ঘটেনি। নেত্রকোণা ও সুনামগঞ্জে কিন্তু বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে। স্থানীয় বৃষ্টির পানি তো হাওরের বেসিনে গিয়ে জড়ো হয়।”

তিনি বলেন, “১২ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চলেছে। সংসদের ভেতরে, বাইরে এমনকি নাগরিকদের মধ্যেও হাওরের বিষয়ে অবহেলা লক্ষ্য করা গেছে। প্রতি বছরের মতো মনোযোগ ও নজরদারিটা লক্ষ্য করা যায়নি।”

এপ্রিলের মাঝামাঝি বন্যা হলে হাওরে আধা কাটা ধান থাকে বলে মন্তব্য করেছেন জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য, বাংলাদেশ বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম। তার মতে, ২০২২ সালেও এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

তিনি বলেন, “নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জে ধান ডুবেছে। অনেকে বজ্রপাতের ভয়ে জীবনে রিস্ক নিয়ে কাজ করবেÑ এ ধরনের শ্রমিকও পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিয়ে বৃষ্টি হওয়ার আগেই ধান কাটার ব্যবস্থা করতে পারলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’ তিনি পরামর্শ দেন, ‘যেভাবে হোক পানি বের করে দিতে হবে। যতটুকু সম্ভব ফসল বাঁচানো যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ৩ মাসের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনÑ এটি ভালো দিক। তবে এটি সামনে আরও বাড়ানো দরকার। কেননা এই বোরোই হাওরের প্রধান ফসল। এ দিয়েই তারা সারা বছর চলে।”

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “হাওরের কৃষক দুই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এক. সঠিক সময়ে জ্বালানি না পাওয়ায় সেচ দিতে পারেনি ও সেচে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয়েছে। তাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাতে কৃষকের প্রফিট মার্জিন কমে গেছে। দুই. হাওরে আগাম বন্যার কারণে ১০-২০ শতাংশ ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাওরে প্রায় ১০ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হয়। সেখানে ২ লাখ টনের মতো ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে সারা দেশে ১০ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। ইউএসআইডির হিসাবে সাড়ে ৭ শতাংশ ফসল ক্ষতি হবে। তবে আমার ধারণা, ১০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।”

তিনি বলেন, “এই ক্ষতির কারণে দুই ধরনের প্রভাব পড়বে। এক. উৎপাদন কমে খরচ বেড়ে যাবে। দুই. খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। গত ৪ বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত ৪ বছর ধরে এই দেশ লাল তালিকাভুক্ত। এ বছর আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে ১০টি ভালনারেবল খাদ্যসংকট দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এতে করে আমদানি বাড়বে। তাতে করে সাধারণত মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।”

তিনি আরও বলেন, “হাওরে পানি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘ দিনের বিষয়। তবে সাম্প্রতিককালে এই ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা হয়নি। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবেÑ যাতে প্রতি বছর হাওরের মানুষকে এমন ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়। ফসল বিনষ্ট না হয়। সরকার তিন মাসের ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছে। তবে এভাবে ক্ষতিপূরণের বদলে কীভাবে স্থায়ী সমাধান হতে পারে, সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।”

কিশোরগঞ্জে ধান পচনের শঙ্কা

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান নিয়ে কৃষকরা নানামুখী সংকটে পড়েছেন। কাটা ধান শুকাতে না পারায় পচনের আশঙ্কার পাশাপাশি নতুন করে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে মাঠে থাকা কাটা ও আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন তারা। একাধিক কৃষক জানান, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করায় ফসল নষ্ট হলে চরম আর্থিক সংকটে পড়বেন তারা। যেসব কৃষক ধান কেটে ফেলেছেন, তাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। কারণ ক্ষেত থেকে কাটা ধান রোদের অভাবে এবং টানা বৃষ্টিতে ভিজে পচে যেতে পারে। এ অবস্থায় ধানের মানও নষ্ট হবে এবং বাজারমূল্য কমে যাবে। 

সুনামগঞ্জে তলিয়ে গেছে আরও ২ হাজার হেক্টরের ধান

সুনামগঞ্জে নতুন করে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে আরও ২ হাজার হেক্টর জমির ধান। গতকাল শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আরও জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া রোদের অভাবে কাটা ধান শুকাতে না পারায় কৃষকরা শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা খোঁজ-খবর নিচ্ছেন, কৃষকদের ধান কাটা, মাড়াই করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। 

হবিগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত ২০ হাজার কৃষক

হবিগঞ্জে বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কৃষকের। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার পাল। তবে কৃষকরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। 

নলছিটিতে অধিকাংশ ক্ষেত পানির নিচে

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ধান মাটিতে শুয়ে পড়েছে, আবার কোথাও পুরো ক্ষেত পানির নিচে ডুবে আছে। যে কারণে লাভের বদলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কৃষকদের।


(প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার প্রতিবেদক এবং প্রতিনিধিরা)

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা