আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬ ০৮:১৬ এএম
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর তথ্যনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে ডেসকো লোকসানের বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গ্রাহকসেবা আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নে সংস্থাটি সাফল্যের দাবি করলেও, অন্যদিকে আর্থিক লোকসান এবং বিশাল ঋণের বোঝা প্রতিষ্ঠানটির মেরুদণ্ড নড়বড়ে করে দিয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর তথ্যনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে ডেসকো লোকসানের বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ২০২৪ সালে ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা নিট লোকসানের পর, ২০২৫ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি ১২৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। আয়ের এই নেতিবাচক ধারার কারণে পুঁজিবাজারে ডেসকোর শেয়ার বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে এসেছে। এমনকি ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসেও কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক (০.৮১ টাকা) রয়ে গেছে।
এদিকে কোম্পানিটির ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে। ডিএসইর ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ডেসকোর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কোম্পানিটির মাথায় প্রায় ৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকার ঋণের বোঝা চেপেছে। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৯৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। উল্লেখ্য, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি নিয়মিত ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি।
সর্বশেষ গত বৃস্পতিবার ডেসকোর শেয়ারদরে বড় ধরনের পতন লক্ষ করা গেছে। ওইদিন লেনদেন শেষে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানিটির শেয়ারের দর এক দিনেই ৭ শতাংশ কমেছে।
ডিএসইর বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদিন ডেসকোর শেয়ারের সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২২ টাকা ৬০ পয়সায়, যা আগের দিনের তুলনায় ১ টাকা ৭০ পয়সা কম। আগের দিন এই শেয়ারের সমাপনী মূল্য ছিল ২৪ টাকা ৩০ পয়সা। দিনের শুরু থেকেই কোম্পানিটির শেয়ার বিক্রির চাপ লক্ষ করা যায়, যার ফলে একপর্যায়ে এটি ২২ টাকা ৬০ পয়সার সর্বনিম্ন সীমা স্পর্শ করে। গত ৫২ সপ্তাহের মধ্যে এটি শেয়ারটির সর্বনিম্ন মূল্য, কারণ এই সময়ের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের সর্বোচ্চ দর ছিল ২৬ টাকা ৮০ পয়সা এবং সর্বনিম্ন ১৮ টাকা ১০ পয়সা। বর্তমানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৬৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
ডেসকোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনের চিত্রটি খুবই হতাশার। ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরে কোম্পানিটি কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও, ২০২৩ সাল থেকে বিশাল অঙ্কের লোকসানের কবলে পড়ে। ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা। পরবর্তী বছর ২০২৪ সালেও ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে লোকসান কিছুটা কমিয়ে ১২৫ কোটি ১৯ লাখ টাকায় নামিয়ে আনলেও তা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে যথেষ্ট হয়নি।
কোম্পানিটির আয়ের সূচক শেয়ার (ইপিএস) পর্যালোচনায় দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক বিবরণী ২০২৬ অনুয়ায়ী, প্রথম ৯ মাসে এর অবস্থা বেশ নাজুক। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ইপিএস ১.৪৭ টাকা থাকলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এসে (জানুয়ারি-মার্চ) তা ঋণাত্মক ০.৮১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে ৯ মাসের হিসেবে ইপিএস ১.৪৬ টাকায় অবস্থান করছে। ২০২১ সালে শেয়ারপ্রতি আয় ১.৮৬ টাকা থাকলেও ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছিল মাইনাস ১২.৭২ টাকায়। ২০২৫ সালে ইপিএস ছিল মাইনাস ৩.১৫ টাকা। ২০২১ সালে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য যেখানে ৬৫ টাকা ২৪ পয়সা ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ৩৫ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডেসকোর মালিকানায় সরকারের বড় অংশীদারত্ব (৬৭.৬৬ শতাংশ) থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটি নিয়ে অনাস্থা বাড়ছে। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ২৩.৪৩ শতাংশ শেয়ার এবং সাধারণ জনগণের হাতে মাত্র ৮.৮৭ শতাংশ। ৩০ এপ্রিলের লেনদেনে দেখা যায়, দিনজুড়ে মোট ৩১৩টি হাওলার মাধ্যমে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩০১টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৫১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
ডেসকোর এই আর্থিক পতনের পেছনে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, অতিরিক্ত খরচ এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও ৬১৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার একটি ‘পুনর্মূল্যায়ন সঞ্চিতি’ কোম্পানিটির রিজার্ভে যুক্ত আছে, কিন্তু নগদ প্রবাহ বা অপারেশনাল আয় না বাড়লে এই সংকট সহজে কাটবে না।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের অতি সতর্কতার সাথে ডেসকোর মতো দুর্বল মৌল ভিত্তির শেয়ারে লেনদেন করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির কোম্পানি সচিব প্রকৌশলী এসএম শাহ সুলতান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এবারই প্রথম নিট প্রফিট সামান্য হলেও বেড়েছে। তিনি দেড় মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাননি।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের অব্যাহত সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সেবার মানোন্নয়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর গঠিত হয় ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (ডেসকো)।
মূলধন ও প্রারম্ভিক কার্যক্রম প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে ডেসকো আনুষ্ঠানিকভাবে তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। সে সময় ৫০০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে তৎকালীন ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথরিটি (ডেসা) থেকে মিরপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা অধিগ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
গত কয়েক দশকে মিরপুর থেকে শুরু করে রাজধানীর একটি বড় অংশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে ডেসকো দায়িত্ব পালন করে আসছে। মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, কল্যাণপুর, ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান, বনানী, মহাখালী, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বারিধারা, বাড্ডা, টঙ্গী এবং পূর্বাচলসহ প্রায় ২৪৫ বর্গকিলোমিটার ডেসকোর আওতাভুক্ত।
ডেসকো সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে সংস্থাটির গ্রাহক সংখ্যা ১২ লাখ ৪০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭৮ জনে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে সংস্থাটি প্রাক-পরিশোধ বা প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনে বিশেষ জোর দিয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রি-পেমেন্ট মিটারের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭১ হাজারের কিছু বেশি, ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। গত তিন বছরের ব্যবধানে ডেসকোর সিস্টেম লস ৫.৭২ শতাংশ থেকে কমে ৫.৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে ডেসকোর বিতরণ লাইন ৬ হাজার কিমি অতিক্রম করেছে।