× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কঠিন শর্তের ঋণে ঝুঁকছে বাংলাদেশ

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৩:৪৯ পিএম

দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদ ও দীর্ঘমেয়াদি নমনীয় ঋণের ওপর ভর করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদ ও দীর্ঘমেয়াদি নমনীয় ঋণের ওপর ভর করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদ ও দীর্ঘমেয়াদি নমনীয় ঋণের ওপর ভর করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিÑ সব ক্ষেত্রেই এমন সহজ শর্তের ঋণ ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু সাম্প্রতিক একাধিক ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে, সেই পথ থেকে সরে এসে ব্যয়বহুল ও কঠিন শর্তের ঋণে ঝুঁকছে দেশ। নতুন করে অনুমোদিত ১৯০ কোটি ডলারের ঋণ প্যাকেজে ১৬০ কোটি ডলারই কঠিন শর্তের ঋণ। এতে মিলেছে পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় এই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, রাজস্ব ঘাটতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার এখন এমন ঋণ গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে, যেগুলোর শর্ত আগের তুলনায় অনেক কঠিন।

সহজ ঋণ মিলছে কম

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে অত্যন্ত অনুকূল শর্তে ঋণ পেয়ে এসেছে। এসব ঋণে সুদের হার ছিল কম, গ্রেস পিরিয়ড দীর্ঘ ও পরিশোধের সময়সীমা ছিল বিস্তৃত। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপও ছিল সহনীয়।

কিন্তু সেই সুযোগ দ্রুত কমে আসছে। উন্নয়ন সহযোগীরা এখন ক্রমশ বাজার ভিত্তিক ঋণের দিকে ঝুঁকছে এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকেও নিয়ে আসছে সেই ধারায়। নতুন অনুমোদিত ঋণগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনুদান পরিমাণ কমে যাওয়ায় এগুলো কার্যত বাজারমূল্যের কাছাকাছি ঋণে পরিণত হয়েছে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ৭৫ কোটি ডলারের সহায়তার মধ্যে ৪৫ কোটি ডলারই এসেছে অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্সেস থেকে, যা নন-কনসেশনাল বা কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে বিবেচিত। এই অংশে সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি ও পরিশোধকাল তুলনামূলক কম। একইভাবে সহ-অর্থায়নকারী ঋণগুলোর মধ্যেও কঠিন শর্তের আধিক্য দেখা যাচ্ছে।

বাজেট চালাতে বৈদেশিক ঋণ

অনুমোদিত ঋণ প্যাকেজের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এর একটি বড় অংশ সরাসরি বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা। প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ব্যয় হবে সরকারের চলতি ব্যয় ও আর্থিক চাপ সামাল দিতে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য নেওয়া ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বাজেট সহায়তা হিসেবে নেওয়া ঋণ সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে অবদান রাখে না। ফলে এর আর্থিক প্রতিফলন তুলনামূলক কম, কিন্তু দায় থেকে যায় দীর্ঘমেয়াদে।

সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাজেট সহায়তা ছাড়া বিকল্প সীমিত। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে চাপ ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতিÑ সব মিলিয়ে সরকারকে দ্রুত অর্থ জোগাড় করতে হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে প্রতিদিনের বাংলাদশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন নন-কনসেশনাল ও ব্লেন্ডেড ঋণের দিকে যাচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।’ 

শর্তের কড়াকড়ি ও ব্যয়ের বাস্তবতা

কঠিন শর্তের ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হারই একমাত্র সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নানা ধরনের ফি ও শর্ত। নতুন অনুমোদিত ঋণগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে কমিটমেন্ট ফি, ফ্রন্ট-এন্ড ফি ও পরিবর্তনশীল সুদের হার যুক্ত রয়েছে।

এআইআইবির ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা অতীতে পাওয়া নমনীয় ঋণের তুলনায় অনেক বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণাত্মক অনুদান উপাদান, যা দেখায় এই ঋণ প্রকৃত অর্থে সুবিধাজনক নয়।

এডিবির অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্সেস (ওসিআর) ঋণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সুদের হার তুলনামূলক বেশি ও গ্রেস পিরিয়ড কম হওয়ায় দ্রুত ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও ঋণনির্ভরতা

অন্যদিকে সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচিও থামাচ্ছে না। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পটি আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই ঋণটিও কঠিন শর্তের হওয়ায় এর ব্যয় তুলনামূলক বেশি। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশই বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ভবিষ্যতে এর আর্থিক চাপ সরকারের ওপরই পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প চালু রাখা জরুরি হলেও এর অর্থায়নের ধরন এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহজ ঋণ না থাকলে ব্যয়বহুল ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমা নির্ধারণ

বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু নীতিগত সীমা নির্ধারণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনমনীয় ঋণের বার্ষিক পরিশোধ ব্যয় রপ্তানি আয়ের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হবে এবং মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অনুপাতের নিচে রাখতে হবে।

এ ছাড়া যেসব ক্ষেত্রে নমনীয় ঋণ পাওয়া সম্ভব নয়, কেবল সেসব ক্ষেত্রেই কঠিন শর্তের ঋণ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কাগজে-কলমে সীমা নির্ধারণ করলেই ঝুঁকি কমে না। বাস্তবে এসব সীমা কতটা মানা সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে যখন বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ একসঙ্গে কাজ করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই পরিবর্তনকে অনেকেই একটি স্বাভাবিক রূপান্তর হিসেবেও দেখছেন। অর্থনীতি বড় হলে ও আয় বাড়লে সহজ ঋণের সুযোগ কমে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু একই সময়ে যদি রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী না হয় এবং বৈদেশিক আয় পর্যাপ্ত না বাড়ে, তাহলে ব্যয়বহুল ঋণের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়ছে

বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়লেও ঋণপ্রাপ্তি কমছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৩২১ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। 

ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১২৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার; যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১২০ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসেবে প্রায় চার কোটি ডলার বেশি সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে। 

এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২০১ কোটি ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ আসল পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ১৬ কোটি ডলার। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা