মে দিবস
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ০৮:২৬ এএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ১৪:৫৬ পিএম
জীবনীশক্তি খরচ করে ভারী কাঠের গুঁড়ি বয়ে চলেছেন করাতকলের শ্রমিক। ছবি: আলী হোসেন মিন্টু/ প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে বৈশাখের মেঘলা আকাশ। ঘড়ির কাঁটায় ভোর ৬টার ঘর। আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে ঢাকা। কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে নগরবাসী। বেলা যত বাড়ছে, ততই ব্যস্ত হয়ে উঠছে নগরীর যাত্রাবাড়ী এলাকা। হঠাৎ চোখ দুটো আটকে গেল যাত্রাবাড়ী থানার পশ্চিমপাশের ফুটপাতে। ধীরপায়ে হেঁটে এসে থানার পশ্চিমপাশের দেয়ালঘেঁষা ফুটপাতে দাঁড়ালেন ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধ। সঙ্গে একটি মাটি কাটার কোদাল, ঝুড়ি আর মাথার বিড়া। দেখেই বোঝা যায়, খেটে খাওয়া মানুষ।
কথা বলতেই জানা গেল, তার নাম আবদুর রহমান। পুরোপুরিই দিনমজুর। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার পাতাবুনিয়ায়। প্রায় ২৬ বছর আগে জীবিকার তাগিদে আর ভাগ্যবদলের আশায় বাড়ি ছেড়েছেন তিনি। প্রতিদিন ভোরবেলায় এখানে আসেন কাজের সন্ধানে। মাটি, ইট-বালু, পাথর-সুরকির বোঝা বহন করেন। জীবিকা বদলায়নি, বরং দিন যত গেছে ততই পাকাপোক্ত হয়েছে। ভাগ্যও বদলায়নি। যদিও আশা ছাড়েননি। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, সে বয়সেও তাই প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে এসে দাঁড়ান থানার পশ্চিমপাশের এই ফুটপাতটাতে।
আবদুর রহমানের মতো অসংখ্য শ্রমিক যখন এমন জীবন কাটাচ্ছেন, তখন আবারও এসেছে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিনÑ মহান মে দিবস। বাংলাদেশে এ বছর এ দিবসের প্রতিপাদ্য : ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত।’ গতকাল বৃহস্পতিবার এ উপলক্ষে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মন্তব্য করেছেন যে, মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ‘এক গৌরবোজ্জ্বল দিন’। তিনি বলেছেন, “শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য সময়োপযোগী হয়েছে বলে আমি মনে করি।”
মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “শ্রমজীবী মানুষই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) একটি জরিপমতে, দেশে আবদুর রহমানদের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের সংখ্যা ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার। আরেকটি জরিপমতে, বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ৮ কোটিÑ যাদের ৮৫ শতাংশ বা ৭ কোটি মানুষেরই কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনার থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। যাদের ১৮৫ জনই পুরুষ। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পরিবহন খাতে। এ খাতে মৃত্যু ঘটেছে ১০৭ জনের। এ ছাড়া কৃষিতে ১৯, নির্মাণে ১৪, প্রবাসী শ্রমিক ১১, দিনমজুর ১১, মৎস্য খাতে ৯, বিদ্যুৎ খাতে ৬ এবং অন্যান্য খাতে ৯ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার, এদেশের শ্রমিকদের জীবন কত অনিরাপদ ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ; তারা কত অধিকারহীন।
আবদুর রহমানের কথাই বলা যাক। গ্রাম ছাড়তে হয়েছে জীবিকার অন্বেষণে, কিন্তু ২৬ বছরেও জীবন পাল্টায়নি। দুই সন্তান (মেয়ে) সংসারের প্রচলিত নিয়মে চলে গেছে স্বামীর ঘরে। প্রৌঢ় হয়ে গেলেও স্ত্রীসহ সংসারের এই ভার বহন করতে হচ্ছে তাদের দুজনকেই।
কথায় কথায় আব্দুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বললেন, “মাটি-ইটা-বালু টানি। বোঝা বইÑ আর কী কমু, কষ্ট তো অয়ই। এই বয়সেও মাটির বোঝা টানতে অয়। কোনো দিন ৮০০, আবার কোনো দিন ৯০০ টাকা আয় অয়। ২৬ বছর আগে ঢাকায় আইছি ভাগ্য বদলাইতে। কিন্তু কোনো উন্নতি অইল না। এই কোদাল-ঝুড়ির মধ্যেই আইটকা আছি। আমার দুইডা মাইয়া। অরা টাহা দেবে কই থেইকা? কোনো পোলা নাই। আমরা বুড়া-বুড়ি দুইজন। কোনোভাবে খাইয়া-না খাইয়া দিন চইলা যায়।”
গত বুধবার সকালে আবদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে এসে জড়ো হন আরও কয়েকজন। তারাও দিনমজুর। কাজ করেন নির্মাণশ্রমিক হিসেবে। তাদের একজন নরসিংদীর বাবুরহাটের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস আলী। একসময় তিনি তাঁতের কাজ করতেন। নিজেই তাঁত বুনতেন। কিন্তু সেই কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাকায় এসেছেন। থানার পশ্চিমপাশের এই ফুটপাতে আসতে আসতে তার মতো অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে, তবে কার বাড়ি কোনখানে, তা জানা নেই।
আবদুল কুদ্দুস আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রায় ২২ বছর আগে আইছি ঢাকায়। এখন জেলেপাড়ার একটা মেসে থাকি। প্রতিদিন বদলা দিয়া খাওন লাগে। যেই কাজ পাই, ওইটাই করি। ইট-বালু টানি, রাবিশ টানি, যে যেটা করায়। আগে তাঁতের কাজ করতাম, নিজের হাতে কাপড় বানাইতাম। ওই কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঢাকায় আইতে হইছে। গতর বালা থাকলে প্রতিদিনই এখানে আইয়া দাঁড়াই। কাজ করে কখনও ৮০০, আবার কখনও ৯০০ টাকা পাই। এই দিয়া আল্লাহই সংসার চালায়। আমার পোলা-মাইয়া ৭ জন। সবাই বড় হইয়া যার যার সংসার লইয়া থাকে। আমরা বুড়া-বুড়ি দুইজনÑ এই সংসারডা এখনও আমিই চালাই।’
বন্ধের দিন শুক্রবারও এখানে আসেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “শুক্রবারও আসি। যদি কাম না পাই, তয় খালি হাতে ফিরি।”
রাজমিস্ত্রি নাসির ফুটপাতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভোর সাড়ে ৬টায়। প্রায় ৪০ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন তিনি। ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন রাজমিস্ত্রির। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাসিন্দা তিনি। পরিবারে স্ত্রী, সন্তান ও শাশুড়ি মিলিয়ে ৭ জনের সংসার। বর্তমানে তিনি যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোড এলাকায় একটি মেসে ভাড়া থাকেন। তার ভাষায়, এখন কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
নাসির বলেন, “দুই বছর আগেও এহানে আইসা বসার টাইম পাইতাম না। এহন কাজই নাই। বেলা নয়টা পারায়া যায়, কেউ নেয় না। মেসে ফির্যা যাই। বাড়ি থেইকা আইছি এক মাস অইছে, অ্যার মধ্যে কাম পাইছি ১৩ দিন।”
কাজ না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হেতা কইতে পারি না। দৈনিক মজুরি এক হাজার টাকা, আর জোগালির (হেলপার) কামে ৮০০ টাকা। কিন্তু পেত্যেক দিন কাম পাই না। সংসার টানা খুব মুশকিল অইয়া গ্যাছে।” অনেকে কাজে নিয়ে অতিরিক্ত খাটুনি খাটায় বলেও জানান নাসির।
কথা শেষ না হতেই পাশ থেকে মহিউদ্দিন নামে আরেক শ্রমিক বলে ওঠেন, “কাম হলি পয়সা পাই, কাজ নাই পয়সা নাই। যা পাই, সব খরচের খাতায় চলে যায়। জমাইতে পারি না। এই কাজ করেই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা চালাই। অসুখ-বিসুখ হলিও কুনু উপায় নাই।”
তিনি জানান, প্রতিদিন কাজ মেলে না। মাসে গড়ে ১৫ দিন কাজ হয়। কোনো কোনো মাসে তা বেড়ে ২০ থেকে ২২ দিন হয়। কাজ করেও প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, “দুই বছর আগে স্বামীবাগে ১০ দিন কাজ করছি। কিন্তু সব টাকা পাই নাই। ৫ দিনের টাকা দিয়া কন্ট্রাক্টর মালিকের কাছ থেইকা পুরো টাকা লইয়া পালাইয়া গেছে।”
এই শ্রমিকদের শ্রম ও ঘামেই গড়ে ওঠে সভ্যতার অবকাঠামো, বিস্তৃত হয় নাগরিক সেবা-সুবিধা, নির্মিত হয় দালানকোঠা, সড়ক-মহাসড়ক ও বন্দর। কিন্তু সভ্যতা গড়ার এই কারিগররা অধিকারহীনই রয়ে গেছেন। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিকেরা আন্দোলন করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন। কাজের সময় দৈনিক আট ঘণ্টায় নিয়ে আসার দাবিতে ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শ্রমিকরা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এইদিন আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ বেশ কয়েকজন শ্রমিককে হত্যা করে, অনেকেই হন আহত। এরপর ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পর ১৮৯০ সালের পহেলা মে থেকে সারা বিশ্বের শ্রমিকরা এই দিবস পালন করে আসছেন।
কর্মসূচি
দিবসটি উপলক্ষে সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আজ সকাল ১০টায় চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক আলোচনা সভা করবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও আজ মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান করবে। দিবসটি উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আজ দুপুরে ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক শ্রমিক সমাবেশ করবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জাতীয় পার্টি দিবসটি উপলক্ষে এক বিবৃতির মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। সিপিবি আজ মে দিবসে বিকাল ৩টায় সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরে। এ উপলক্ষে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন আজ বেলা ৩টায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করবে।