শিক্ষকের এমপিওভুক্তি
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৩ এএম
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৫ এএম
দীর্ঘ ৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এমপিও সুবিধার বাইরেই রয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৪১৪টি বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের প্রায় ৩৫০০ শিক্ষক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
একে একে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৩৩ বছর। কিন্তু এখনও এমপিও সুবিধার বাইরেই রয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৪১৪টি বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের প্রায় ৩৫০০ শিক্ষক। অথচ ১৯৯২ সালে দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ছিল এসব কলেজগুলোকে কার্যকর ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ করা।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনায় এই শিক্ষকরা বর্তমানে ক্ষোভ ও সংশয়ে আক্রান্ত। সর্বশেষ গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের নীতিগতভাবে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত এখনও বাস্তবায়ন না হওয়ায় নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
আন্দোলনের ঘোষণা, স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে
চলতি অর্থবছরে এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন এই শিক্ষকরা। পাশাপাশি দেশের ৬৪ জেলা থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও স্মারকলিপি দিয়েছেন। তবুও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় আগামী মে মাসের শুরুতে ফের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।
শুরু থেকেই বৈষম্যের অভিযোগ
শিক্ষকরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপ কমাতে ১৯৯২ সালে তৎকালীন খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের আমলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৩ সালে অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হয়।
তবে শুরুতেই বৈষম্যের বীজ বপন হয়। কারণ সেসময় টাঙ্গাইলের জিবিজি কলেজে অনার্স পর্যায়ের মাত্র আটজন শিক্ষককে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত করা হলেও পরে তাদের আর কেউ এই সুবিধা পাননি। একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, ‘শুরুতেই যদি সবার জন্য নীতিমালা তৈরি করা হতো, তাহলে আজকের এই সংকট তৈরি হতো না।’
নীতিমালায় পরিবর্তন, কিন্তু বাস্তবতা অপরিবর্তিত
শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তাদের মধ্যে আশার আলো জ্বলে। ২০২৫ সালের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় প্রথমবারের মতো অনার্স-মাস্টার্স কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে এমপিওভুক্তির একটি কাঠামোগত পথ তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা এখনও কাগজেই সীমাবদ্ধ।
শিক্ষকদের হিসাবে, বর্তমানে ৪১৪টি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে কর্মরত প্রায় ৩৫০০ শিক্ষক এমপিওবঞ্চিত। যাদের অনেকেই ১৫-২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। একজন শিক্ষক বলেন, “আমরা একই প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করি। তারা সরকারি বেতন পান, আমরা পাই নাÑ এটা শুধু বৈষম্য নয়, অপমানও।” তাদের দাবি, এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এর কিছু শর্ত শিথিল করে বিশেষ বিবেচনায় দ্রুত এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করা হোক।
শুধু মানবিক নয়, নীতিগত সমস্যা
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধু মানবিক নয়, বরং নীতিগত ও কাঠামোগত একটি বড় সমস্যা। শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. শহীদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে উচ্চশিক্ষা দিচ্ছেন, তাদের এমপিওর বাইরে রাখা নীতিগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি শিক্ষার মানকেও প্রভাবিত করে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, একসঙ্গে ৩৫০০ শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ পড়বে ঠিকই, তবে সেটি অযৌক্তিক নয়। তারা বলছেন, শিক্ষা খাতে ব্যয়কে খরচ হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকদের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। ইতোমধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক দিকগুলো সমন্বয় করা হচ্ছে।”
শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বলেন, “এমপিওভুক্তির বিষয়টি একটি প্রক্রিয়াগত ব্যাপার। কিছু শর্ত ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া রয়েছে, আমরা সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, “শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি।”
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোখশনা সুলতানা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ ৩৩ বছর অপেক্ষা করেছি। এবার যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচি আসবে।’
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।