আরমান হেকিম, রূপপুর (পাবনা) থেকে
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৪ এএম
আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৬ এএম
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মঙ্গলবার ইউরেনিয়াম লোড শুরু। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের বড় ধরনের রূপান্তর ঘটলে। ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ করানো শুরু হয়েছে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এর মধ্যে দিয়ে দেশ প্রবেশ করল পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে। আর এই রূপান্তর ঘটলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে। আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে নিতে হয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, অতিক্রম করতে হয়েছে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কঠোর প্রোটোকলের পথ। গতকাল মঙ্গলবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১-এ জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায় একটি পরিণত রূপ পেল।
রূপপুর প্রকল্প এলাকায় গতকাল বিকালে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফিজিক্যাল স্টার্ট আপ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সিই এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি প্রমুখ।
দীর্ঘ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই ধাপকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করছেন। কারণ এখান থেকেই প্রকৃত পারমাণবিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে; যদিও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “আমরা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নের এক নতুন যুগে পদার্পণ করল। এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, এটি আমাদের আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের প্রতীক।”
তিনি বলেন, “প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অত্যাধুনিক। নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি ধাপে কঠোরভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রকল্পে বহুমাত্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। যা যেকোনো ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম।”এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য ভ্লাদিমির পুতিন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি বাস্তব উদাহরণ, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।”
জ্বালানি লোডিং মানেই তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ নয়
রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুল্লির কেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে পারমাণবিক কার্যক্রম শুরু হলেও এটি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যায় নয়। বরং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার সূচনা।
এই ধাপে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম ফুয়েল অ্যাসেম্বলি চুল্লির কোরে স্থাপন করা হবে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলির মধ্যে থাকা ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড পিলেট নিয়ন্ত্রিত ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করবে। এই তাপ থেকে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করবে।
জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়াটি প্রায় ৩০ দিন চলবে বলে জানানো হয়েছে। পুরো সময়টি কঠোর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হবে।
জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ার পর শুরু হবে রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স টেস্টিং পর্যায়। এই ধাপে চুল্লির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হবে। এটি প্রায় ৩৪ দিন ধরে চলবে। এরপর ধীরে ধীরে ক্ষমতা বৃদ্ধির ধাপ শুরু হবে, যা চলবে প্রায় ৪০ দিন। এই সময়ে চুল্লির শক্তি ১ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ৩ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ এবং আরও উচ্চপর্যায়ে উন্নীত করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করতে জ্বালানি লোডিংয়ের পর ২৯ থেকে ৩০ দিন সময় লাগতে পারে। এই পর্যায়ে চুল্লি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে।
গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়রেখা
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুল্লি প্রায় ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো হবে। পুরো ইউনিট-১ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকল্পের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০-১২ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে রূপপুর প্রকল্প
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, জ্বালানি লোডিং কোনো সাধারণ ‘চালু করা’ প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি দীর্ঘ, ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, ‘ফিশন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং শক্তি বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি থেকে যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়
রূপপুরের ইউনিট-১-এ ব্যবহৃত ফুয়েল অ্যাসেম্বলিগুলোতে ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড পিলেট ব্যবহার করা হয়েছে। চুল্লির ভেতরে এই জ্বালানি নিয়ন্ত্রিত ফিশন প্রক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপ পানি উত্তপ্ত করে উচ্চচাপের বাষ্পে রূপান্তরিত করে। সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ব্যবহৃত জ্বালানি অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় হওয়ায় তা নির্দিষ্ট সময় পর আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে।
প্রকল্পটি রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সেই লিখাচেভ বলেন, “জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে চুল্লি কার্যত জীবন্ত অবস্থায় প্রবেশ করেছে এবং এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক সক্ষমতার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”
আইএইএ মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বলেন, এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ভবিষ্যতের সূচনা। তিনি জানান, শুরু থেকেই আইএইএ প্রকল্পটির নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারণা প্রথম আসে ১৯৬১ সালে। তবে দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। ১৯৯৫ সালে এটি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন এবং রাশিয়ার সংস্থা অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পে নির্মাণ, সরঞ্জাম সরবরাহ, কমিশনিং এবং প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধাপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থনৈতিক ও জ্বালানি প্রভাব
সরকারি হিসেবে রূপপুর প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। বছরে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করেও এটি তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করবে। প্রকল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ২৫০০ জন স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্মাণ পর্যায়ে ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেছেন। প্রকল্পটি ৬০ বছর পর্যন্ত চালু রাখা যাবে, যা প্রয়োজনে ৯০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। প্রতিটি ফুয়েল সাইকেল প্রায় ১৮ মাস পর পর পরিবর্তন করতে হবে।
ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলম্ব
প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা থাকলেও তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন, মুদ্রার ওঠানামা, কোভিড পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সময় ও ব্যয় উভয়ই প্রভাবিত হয়েছে।
বর্তমানে ইউনিট-১-এর লক্ষ্য সময় ডিসেম্বর ২০২৬ এবং ইউনিট-২ এর ডিসেম্বর ২০২৭। পুরো প্রকল্পের পূর্ণ কমিশনিং ধরা হয়েছে জুন ২০২৮।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
দিনের শুরুতে রোসাটমের প্রধান অ্যালেক্সেই লিখাচেভ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। গতকাল সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ কথা জানান। তিনি জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে রাশিয়ার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। রোসাটম মহাপরিচালক অ্যালেক্সেই লিখাচেভ বাংলাদেশের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের যাত্রায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করার বিষয়েও তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং ঢাকায় নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিন উপস্থিত ছিলেন।