× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিগগিরই কমছে না নাছোড় লোডশেডিং

দীপক দেব

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯ এএম

শিগগিরই কমছে না নাছোড় লোডশেডিং

চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি ও গ্যাস সংকট এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে লোডশেডিং। এতে জনজীবনে যেমন দুর্ভোগ নেমেছে, তেমনি কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের আগে এই সংকট নিরসনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করেছে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে লোডশেডিং কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে।

এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশীয় শিল্প খাতে উৎপাদন কমেছে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া সেচ নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষক। ফলে কৃষি খাতেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটায় মূলত গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৪৩ শতাংশই গ্যাসভিত্তিক। যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে সেখানে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ ছাড়া রয়েছে ২২ শতাংশ কয়লাভিত্তিক ও ১৯ শতাংশ ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর বাইরে রয়েছে আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও অধিকাংশ সময় উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দিয়ে ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হলেও তিনটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বৃহৎ সক্ষমতা উৎপাদনে না থাকায় সম্প্রতি লোডশেডিং বেড়ে গেছে। আদানি, এসএস পাওয়ার ও আরএনপিসিএলের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট। বর্তমানে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় গ্রিডে এ তিনটি কেন্দ্র থেকে আসছে ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট; যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৩৯ শতাংশ। 

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আদানি পাওয়ার একটি ইউনিট গত কয়েক সপ্তাহ থেকে বন্ধ রেখেছিল। গতকাল রবিবার থেকে সেটি আবারও চালু হওয়ার কথা থাকলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে ওই কেন্দ্র থেকে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হয়নি। অন্যদিকে এসএস পাওয়ার ও আরএনপিএল আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ৬০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আরএনপিএল হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত নরিনকোর যৌথ উদ্যোগ। কেন্দ্রটি আগামীকাল থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসির (পিজিসিবি) দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত শুক্রবার থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। 

এ প্রসঙ্গে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা চলতি মাসের মধ্যেই আদানি পাওয়ার, চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার এবং পটুয়াখালীভিত্তিক আরএনপিএল যৌথ উদ্যোগ থেকে ১ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছি।’ এর আগে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা বলেন, ‘আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। এতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।’

ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন : এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশীয় শিল্প খাতে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। এর ফলে লোকসান বেড়ে যাওযায় দুশ্চিতায় রয়েছেন শিল্প মালিকরা। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে শুরু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্পকারখানাগুলোও বড় ধরনের চাপে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতে এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ঘাটতি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমেছে। এর সঙ্গে পরিবহনের বাড়তি ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে। গত দুই মাসে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, ওষুধ, হিমায়িত মৎস্য ও ভোগ্যপণ্য তৈরির কারখানায় উৎপাদন কমেছে গড়ে ২৪ শতাংশ। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের রপ্তানি আয়ের ওপরও। 

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘পোশাক কারখানার সার্বিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর আট মাস ধরে পোশাক খাতে রপ্তানি কমে যাওয়ার ধারা অব্যাহত আছে। এটা দেশের জন্য অশনিসংকেত।’

সেচ নিয়ে বিপাকে কৃষক : জ্বালানি সংকটের কারণে সেচনির্ভর বোরো মৌসুমে বিপাকে পড়েছে দেশের কৃষক সমাজ। ডিজেল ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে সেচকার্য। যে কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই উৎপাদন ব্যয়ে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, আগে প্রতিবিঘা জমিতে চাষাবাদে ব্যয় হতো ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা; এখন তা বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকা। এতে লাভের সম্ভাবনা কমে গিয়ে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। যদিও কৃষকের সেচের সুবিধা করে দিতে ঢাকায়ও লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। 

১০ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাবে দেশে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই কমিটির মেয়াদ হবে প্রজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিন। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে এই প্রস্তাব পাস হয়। এর আগে কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে বৈশ্বিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যার আঁচ বাংলাদেশেও এসে লেগেছে। এরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে সংসদে ঐতিহাসিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিরোধী দলের নেতার প্রস্তাবমতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ১০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠনে একমত হয়েছেন।’ 

উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অনেকেই মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমাধানের পথ নির্ধারণের জন্য ঐকমত্য খুবই জরুরি। কারণ এই সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। এই উদ্যোগ জনমনে যে আতঙ্ক রয়েছে, তা দূর করতেও বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা