‘গোপন চিঠি’ গোপন থাকছে না
তোফাজ্জল হোসেন কামাল
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৬ পিএম
নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পুলিশ সদর দপ্তরের গোপনীয় (কনফিডেনসিয়াল) শাখার কাজ স্পর্শকাতর তথ্য-প্রমাণ গোপন রাখা। কিন্তু সম্প্রতি ওই শাখার কোনো কিছুই আর গোপন থাকছে না; খুব জরুরি বা গোপনীয় বিভিন্ন তথ্যও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও ওই শাখায় প্রদত্ত একটি জরুরি/গোপনীয় নির্দেশনামা ফাঁস হয়ে গেছে, ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে।
ওই চিঠির মাধ্যমে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা নিয়ে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটকে একটি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তা সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই কী করে নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েÑ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং পুলিশ সদর দপ্তরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়েছে। এই গোপনীয় চিঠি সামাজিক মাধ্যমে চলে আসায় যাদের সম্পর্কে এই সতর্কবার্তা বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তারা খুব সহজেই বিষয়টি অবগত হয়ে দ্রুত আত্মগোপনে বা সতর্ক অবস্থানে চলে যেতে সক্ষম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের ওই শাখার জারি হওয়া কমপক্ষে ৫টি খুব স্পর্শকাতর ও অতীব জরুরি গোপনীয় চিঠি ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, গত ১৮ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ ‘জঙ্গি হামলার আশঙ্কা, নেপথ্যে এলইটি-টিটিপি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেটি প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ দেশের গোয়েন্দারা। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের চার দিন পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠন সমর্থক কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা সংক্রান্ত’ একটি জরুরি/গোপনীয় চিঠি পাঠানো হয় প্রত্যেকটি ইউনিট প্রধানের কাছে। এই পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশে’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে জঙ্গিদের সংগঠিত-সম্প্রসারিত হওয়ার ও হামলা পরিকল্পনার যে বিবরণ ও আশঙ্কা করা হয়েছেÑ তা সংশ্লিষ্ট মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে; প্রতিবেদনটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ায় এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যা বলা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে
নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গত বৃহস্পতিবার বাহিনীর ইউনিট প্রধানদের কাছে পাঠানো এ সংক্রান্ত এক বার্তায় ‘নিরাপত্তা জোরদারের’ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের ওই বার্তায় সুনির্দিষ্ট করে কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এতে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, সম্প্রতি সংগঠনটির সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কবে, কোন ইউনিট ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে, বার্তাটিতে তাও স্পষ্ট করা হয়নি।
‘নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সমর্থক কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা সংক্রান্ত’ এই বার্তায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ইসতিয়াকের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর জানতে পেরেছে যে, তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা বিস্ফোরণ, দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে। বার্তায় বলা হয়েছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ বা সেনাবাহিনীর স্থাপনা ও তাদের সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগ চত্বর।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির সদস্যরা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারে এবং এসব ব্যক্তি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশের গোপনীয় শাখার গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ফাঁস : গত বৃহস্পতিবার ডিআইজি (কনফিডেনসিয়াল) স্বাক্ষরিত জরুরি/গোপনীয় একটি সতর্কতামূলক চিঠি ফ্যাক্সের মাধ্যমে পাঠানো হয় পুলিশ বাহিনীর ইউনিট প্রধানদের কাছে। এতে বাহিনীকে এই বলে সতর্ক করা হয়েছিল যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে। এ কারণে চিঠিটিতে ‘নিরাপত্তা জোরদারের’ পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু চিঠিটি ফাঁস হয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এতে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ওই শাখা থেকে কমপক্ষে পাঁচটি গোপনীয় চিঠি ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে বাহিনীর মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও শাখার প্রধান বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। উল্লেখ্য, পুলিশের কনফিডেনসিয়াল শাখার প্রধান সাবেক আওয়ামী লীগ আমলে দেশের দুটি জেলার এসপি পদে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পদোন্নতি পেয়ে সিআইডি শাখা থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ শাখার প্রধান হন। বর্তমান আমলেও তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে দাপটের সঙ্গেই দিনকাল পার করছেন। এসব নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সর্বশেষ চিঠি ফাঁস হওয়া সম্পর্কে জানতে চেয়ে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কনফিডেনসিয়াল শাখার প্রধানকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি।
আমলে নেওয়া হয় না এসবির প্রতিবেদন : পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) মাঠপর্যায় থেকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদর দপ্তরসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন পেশ করা হয়, তা তেমন একটা আমলে নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটি এখন পরিষ্কার যে, দেশে জঙ্গিদের সংঘবদ্ধ ও সম্প্রসারিত হওয়াসহ তাদের পরিকল্পনার খবর জানাতে যেসব প্রতিবেদন দেওয়া হয়, তাতে গুরুত্ব দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সর্বশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা থেকে একাধিকবার জঙ্গি হামলার আশঙ্কার বিষয়ক প্রতিবেদনটি দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, বেশকিছু দিন আগে এসবির গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে চট্টগ্রামে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সদস্যকে ধরার পর তাদের হামলার পরিকল্পনার কথা জানা যায়। এর আগেও সংস্থাটি বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনে জড়িত সদস্যদের ধরে আইনের আওতায় এনেছে বলে জানা গেছে।
জঙ্গি না থাকার রাষ্ট্রীয় বয়ান তৈরি করা হয়েছে : অভিযোগ উঠেছে, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে কোনো ধরনের জঙ্গি নেই বলে রাষ্ট্রীয় বয়ান তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর নীরব ভূমিকার কারণে ওই সময়ে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ দেশের গোয়েন্দাদের জঙ্গি তৎপরতার বিষয় নিয়ে নিরুৎসাহিত করা হতো ওই বিশেষ সহকারীর তরফে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জঙ্গি দমনে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য হন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ‘দেশে জঙ্গি নেই’Ñ এমন মন্তব্য করে আলোচিত হন। ‘আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে, কীসের জঙ্গি?’Ñ এমন মন্তব্যও তিনি করেন। তবে সাজ্জাত আলী ডিএমপি কমিশনার থাকা অবস্থাতেই গত ৩১ জানুয়ারি জঙ্গি সন্দেহে রাজধানী জিয়া উদ্যান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আহসান জহির খানকে (৫০)। ওই ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও করে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে পরবর্তী সময় আরও চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় সিটিটিসি। পরে এই মামলাতেই গত ২ এপ্রিল নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’-এর সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে হবিগঞ্জ থেকে এক শিশুকে হেফাজতে নেওয়ার কথা জানায় ডিএমপি। পরদিন ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জিয়া উদ্যান থেকে গ্রেপ্তার আহসান জহির ও তার সহযোগীদের সঙ্গে হবিগঞ্জ থেকে হেফাজতে নেওয়া ওই শিশুর যোগাযোগ আছে। সে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে শিয়া মসজিদ, পুলিশের চেকপোস্ট ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনা ও উস্কানি দিত বলে দাবি করছে পুলিশ।
জঙ্গি হামলার আশঙ্কা খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কার বিষয়টি উঠে আসার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন ইউনিট। পুলিশ সদর দপ্তরের জারি করা সতর্কতামূলক চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগ।
গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিটিটিসি বিভাগের সিটিটিসি প্রধান ও যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘উগ্রবাদীদের সম্ভাব্য হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তা পেয়ে সিটিটিসির সাইবার ইন্টেলিজেন্স টিম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’ তবে সুনির্দিষ্ট করে কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে শনাক্ত করার বিষয়ে কিছু জানাননি তিনি।
নিরাপত্তা জোরদার ও নজরদারি বৃদ্ধির বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা নিয়ে জানতে চাইলে মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘এটি আমাদের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ, যা প্রকাশ করার বিষয় নয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে আমরা কাজ করছি। কিছু পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’ সশস্ত্র বাহিনীর কতজন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি জানান, তার কাছে এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। গণমাধ্যমে যা এসেছে, তিনিও সেটুকুই দেখেছেন।