তানভীর আহমেদ, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৩ পিএম
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৩ পিএম
সুনামগঞ্জের হাওরে চলছে হারভেস্টারে ধান কাটা ও সংগ্রহ। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে খুলনা বিভাগসহ ২১ জেলা ও অঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ঢাকাতেও তাপপ্রবাহের আঁচ লেগেছে। গরমে অস্থির মানুষ। একটু হাঁটাহাঁটি বা কাজ করলেই হাঁপিয়ে উঠছে।
ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অতি ভারী বৃষ্টির ফলে সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও করা হয়েছে। এজন্য ২৮ এপ্রিলের মধ্যে ৮০ শতাংশ পাকা ধান কেটে ফেলার নির্দেশনা দিয়েছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এ ছাড়া রংপুর, রাজশাহী বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অধিপ্তরের সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানান, গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সিলেট ও ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩৪ ও ৩৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সুনামগঞ্জে জ্বালানি সংকটের কারণে হারভেস্টারে ধান কাটতে না পারায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। সরেজমিন দেখা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিনের মালিকরা। তেলের সংকটের অজুহাতে বিঘাপ্রতি ধান কাটার খরচ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন হারভেস্টার মালিকরা। এই অবস্থায় চাষাবাদ ও কর্তন ব্যয় মিটিয়ে লাভের মুখ দেখা নিয়ে চরম শঙ্কায় পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে হাওরে বেশিরভাগ ধান পেকে গেছে। সপ্তাহখানেক আগেই শুরু হয়েছে ধান কাটা। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় ২২.৫২ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির আশঙ্কায় দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন চাষিরা। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা ও স্থানীয় পর্যায়ে ডিজেল সংকটে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
হারভেস্টার মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলায় সহস্রাধিক হারভেস্টার ও রিপার মেশিন ধান কাটার কাজে নিয়োজিত। একটি হারভেস্টার দিনে-রাতে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ বিঘা জমি কাটতে পারে, যার জন্য দৈনিক ১২০ থেকে ১৫০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে খোলা বাজার থেকে মাত্র ৫০-৬০ লিটারের বেশি তেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
হারভেস্টার মালিক মনির হোসেন বলেন, “দৈনিক ১৫০ লিটার তেল লাগলেও আমরা পাচ্ছি সামান্য কিছু। তাও আবার খোলা বাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। কৃষি অফিসের মাধ্যমে তেল নিতে গেলে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়, তাই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বাড়তি দামে তেল কিনে মেশিন চালাচ্ছি।”
হারভেস্টার চালক আবদুল আজিজ বলেন, “তেলের সরবরাহ না থাকায় দিনের অনেক সময় মেশিন বন্ধ রাখতে হয়। ১৫০-১৬০ টাকায় খোলা বাজার থেকে তেল কিনতে হচ্ছে।”
কৃষক জহিরুল ইসলাম বলেন, “আকাশের অবস্থা ভালো না, প্রতিনিয়ত বৃষ্টি হচ্ছে। নদীর পানিও বাড়তেছে, যেকোনো সময় ঢল নামতে পারে। মেশিনে দ্রুত ধান কাটতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মালিকরা বলছে তেল নেই। ২৫০০ টাকা কিয়ার (৩৩ শতাংশ) চায় হারভেস্টার মেশিনের মালিকরা। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।”
হাওরপাড়ের আরেক কৃষক সুলেমান মিয়া বলেন, “সরকার তেলের দাম বাড়ালেই আমাদের বিপদ। মেশিনের মালিকরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এক বিঘা ধান কাটতে যদি বাড়তি ৭০০ টাকা যায়, তবে আমরা লাভ করব কী? শ্রমিকের মজুরিও বাড়ছে, এখন ৮০০-১০০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন যেন তেলের জোগান বাড়িয়ে কাটার রেট কমিয়ে দেয়।”
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “জেলায় জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। ধান কাটা নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং হারভেস্টারগুলো সচল থাকবে।”
সুনামগঞ্জে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় ফসলের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে হাওরের ৮০ শতাংশ জমির পেকে যাওয়া ধান কেটে ফেলার জন্য কৃষকদের জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গতকাল সকালে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সতর্কবার্তা জারি করেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৩ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হলেও ২৭ এপ্রিল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে। বিশেষ করে ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই অঞ্চলে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু-বাউলাই ও ভুগাই-কংসসহ এ অঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বর্তমানে সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে বিপদসীমার ১.৭৬ মিটার বা ৫.৭৭ ফুট নিচে রয়েছে। তবে, ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
২১ জেলা ও অঞ্চলে তাপপ্রবাহ
ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাও তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম। গতকাল শুক্রবার দুপুর ২টায় দেওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তার কাছাকাছি এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি হতে পারে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
এর প্রভাবে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মি.মি. /২৪ ঘণ্ট) থেকে অতি ভারী (১৮৮ মি.মি. (২৪ ঘণ্টা) বর্ষণ হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও পটুয়াখালী, খুলনা বিভাগসহ ২১ জেলা ও অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।