বোরহান উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০১ এএম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৬ পিএম
১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা নিমেষেই ধসে পড়ায় বিলীন হয়েছিল হাজারো স্বপ্ন। ছবি: রয়টার্স
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ২৪ এপ্রিল আজ। ১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা নিমেষেই ধসে পড়ায় বিলীন হয়েছিল হাজারো স্বপ্ন। আধুনিক বিশ্বের শিল্প ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৪ শ্রমিক, আর পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন দুই সহস্রাধিক মানুষ। আজ সেই শোকাবহ ঘটনার ১৩ বছর পূর্ণ হলো।
ছয়টি প্রধান মামলার মধ্যে একটির রায় হলেও মূল হত্যা মামলাসহ বাকি পাঁচ মামলা এখনও আদালতের বারান্দায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সাক্ষী হাজির না হওয়া ও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশকেই বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবন মালিক সোহেল রানা, তার পরিবার, সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়রসহ বিভিন্ন জনের নামে একাধিক মামলা হয়। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে একটি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) একটি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুটি মামলা করে। এর মধ্যে দুদকের করা একটি মামলায় রায় হয়েছে। অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা হয় আরও দুটি মামলা। এ ছাড়া শ্রম আইনের আদালতে রয়েছে আরও ১১টি মামলা।
আরো পড়ুন: রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছর আজও শাবানার খোঁজে স্বজনরা |
থমকে আছে হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ
পেশাগত অবহেলা ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে সাভার থানার তৎকালীন এসআই ওয়ালী আশরাফ ৪১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলাটি করেন। মামলার চার্জশিটে ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়াও ৫টি পোশাক কারখানার মালিক ও বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। ৪১ জন আসামির মধ্যে ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া বাকি প্রায় সবাই জামিনে রয়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে আপিল বিভাগ ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ মামলাটিতে তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। আগামী ৩০ এপ্রিল মামলাটির পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৮-এর বিচারক মুহাম্মদ মুনির হোসাঈনের আদালতে বিচারাধীন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ বলেন, তৎকালীন সরকারের মামলাটি নিয়ে সদিচ্ছার অভাব ছিল বলে মনে হয়। এটাকে পুঁজি করে তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। দিনের পর দিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মামলাটিতে দীর্ঘ সময় লাগে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে। এরপর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দিলে আসামিরা সেই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যান। প্রায় ছয় বছর উচ্চ আদালতের আদেশে এ মামলার বিচারকাজ স্থগিত ছিল। গত দেড় বছরে আমরা প্রোগ্রেস করেছি। ১০০ জনের বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এখন সাক্ষ্যগ্রহণের সর্বশেষ ধাপে আছি। আশা করছি, খুব দ্রুত আমরা একটা রায় পেতে যাচ্ছি। চলতি বছরের মধ্যেই রায় হতে পারে বলে দাবি করেন এই আইনজীবী। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, শিগগিরই মামলার বিচার শেষ হবে ও ভিকটিমদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।
আইনি গোলকধাঁধায় বন্দি রাজউকের করা মামলাটি
নকশা জালিয়াতি ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ভবন নির্মাণের অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল আহমেদ ১৩ জনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন। পরে ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলার সাক্ষী করা হয় ১৩০ জনকে। ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার তৎকালীন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তার মধ্যে আসামি ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া মামলার আরেক আসামি সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাতউল্লাহর পক্ষে ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর এক বছরের জন্য মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ দেন উচ্চ আদালত।
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মাহবুবুর রহমানের আদালতে বিচারাধীন। এই মামলার ১৬ আসামির সবাই জামিনে রয়েছেন। সবশেষ গত ২০ এপ্রিল এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। এজন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ খান খোকন বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের দুই মামলায় ৯ বছর আগে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটিতে এক আসামির পক্ষে স্থগিতাদেশ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়নি। অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের দুই মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। প্রতিটা মামলা চলমান। আর যে কয়জন সাক্ষী আছে, তারা আসুক। সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষ হোক। আমি চাই দ্রুত একটা সমাধান হোক। রানা সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ। আমি রানার খালাস চাই, আর খালাস না হলে বিচার শেষে সাজা হবে। রানা আর কতদিন জেল খাটবেন? আসামি যাতে ন্যায়বিচার পান সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। রানার হাজতবাস প্রায় ১৩ বছর। সাক্ষী শেষ হচ্ছে না, হাজতবাসও শেষ হচ্ছে না। রানাকে জামিন দিক অথবা দ্রুত বিচার শেষ করুক। তার মতে, আসামি সোহেল রানা বিচারহীনভাবে কারাগারে আটক রয়েছেন।
ভবন নির্মাণে দুর্নীতি
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরপরই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে দেখা যায়, রানা প্লাজা নির্মাণে ছয়তলার অনুমোদন থাকলেও আটতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এ কারণে ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করে দুদক। ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মফিদুল ইসলাম।
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ শারমিন আফরোজের আদালতে যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় মোট ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। ২০২৫ সালের ১৯ মে মামলাটিতে আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি শেষে আদালত যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। গত এক বছর ধরে মামলাটি যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ অধিকতর যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলেও তা হয়নি। আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ মে দিন নির্ধারণ করেছেন।
অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের দুই মামলা
রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে যাওয়ার সপ্তাহখানেক পর ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শাহিন শাহ পারভেজ ধামরাই থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করেন। দুই মামলায় সোহেল রানাকে একমাত্র আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলাগুলো ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবিএম আশফাক উল হকের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সবশেষ গত ৩০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য থাকলেও সাক্ষীরা উপস্থিত হননি। এজন্য বিচারক পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩০ এপ্রিল দিন ধার্য করেন।
দুদকের মামলা
দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা একটি মামলার রায় হয়েছে। ২০১৫ সালের ১২ এপ্রিল দুদকের সহকারী পরিচালক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও তার মা মর্জিনা বেগমের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করেন। মামলায় রানা প্লাজা নির্মাণের তথ্য গোপন করে দুদকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ টাকা জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ করা হয়।
২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর তৎকালীন বিচারক কেএম ইমরুল কায়েস। রায়ে সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তার মা মর্জিনা বেগমকেও তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অবৈধভাবে অর্জিত সাভার বাজার রোডের ৬৯/১ বাড়িটির এক-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন আদালত।