ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৫ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে খরা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় ও কালবৈশাখী ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বে প্রাণহানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে খরা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় ও কালবৈশাখী ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বে প্রাণহানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ। ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫১ বছরে ২৮১টি দুর্যোগের ঘটনায় ৫ লাখ ২০ হাজার ৭৫৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভারতে এর চেয়ে দ্বিগুণ ৫৭৩টি দুর্যোগ হলেও মৃত্যু ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৭ জন মানুষের।
আর বন্যা ও সাইক্লোনে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে এশিয়া মহাদেশ। এই ৫১ বছরে বিশ্বের ১১ হাজার ৭৭৮টি দুর্যোগে ২০ লাখ ৬৪ হাজার ৬২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
স্টেটাস অব মোরালিটি অ্যান্ড ইকোনোমিক ডিও টু ওয়েদার, ক্লাইমেট অ্যান্ড ওয়াটার এক্সট্রিম ১৯৭০-২০২১ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে এপ্রিল-আগস্ট পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হয়
এপ্রিল থেকে জুন এ সময়টায় বাংলাদেশে কালবৈশাখী ও ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা বেশি হয়ে থাকে। দেশের স্মরণকালের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এপ্রিল থেকে আগস্টে হয়েছে। তাই এ সময়টা সমুদ্র উপকূলে ভীতি ও আশঙ্কা তৈরি হয়।
খুলনার দাকোপ উপজেলার কৃষক মৃনাল কান্তি রায়ের পরিবার ৪০ বছরে বহুবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়লেও কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পায়নি। তিনি বলেন, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতিবছরই আমাদের কোনো না কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। এখন ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় মানুষের মৃত্যু হয় না, তবে আমাদের গবাদিপশু ও গৃহপালিত পাখির অনেক ক্ষতি হয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোথাও কোথাও দুর্যোগের তীব্রতা বেড়েছে ও কোথাও কমেছে। অনেক স্থানে অসময়ে বৃষ্টিপাত এবং স্বল্প সময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কোথাও তাপপ্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সাল ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ উষ্ণতম ও ২০২৫ সাল ছিল তৃতীয় উষ্ণতম বছর। বিশ্ব আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে।
কোন মহাদেশে দুর্যোগ বেশি
মহাদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে এশিয়ায়। প্রতিবেদনটিতে ১৯৭০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৫১ বছরে ৩ হাজার ৬১২টি দুর্যোগের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, দুর্যোগে মানুষের মৃত্যু হয়েছে ৯ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৩ জনের। আফ্রিকায় ১ হাজার ৮৩৯টি দুর্যোগে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৫ জনের মৃত্যু, দক্ষিণ আমেরিকায় ৯৪৩টি ৫৮ হাজার ৪৮৪ জনের মৃত্যু, উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ানে ২ হাজার ১০৭টি দুর্যোগে ৭৭ হাজার ৪৫৪ জনের মৃত্যু, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ১ হাজার ৪৯৩টি দুর্যোগে ৬৬ হাজার ৯৫১ জনের মৃত্যু এবং ইউরোপে ১ হাজার ৭৮৪টি দুর্যোগে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি
প্রতিবেদনে জাতিসংঘের হিসাবে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫১ বছরে বন্যা, খরা, অতি তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা সবচেয়ে বেশি হয় এশিয়ায়
১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫১ বছরে বিশ্বব্যাপী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ২০৫০টি। সেখানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের ৩৮ শতাংশই এশিয়ায় ঘটেছে। আর একই সময়ে বন্যার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩১২টির। সেখানে এশিয়ায় বন্যা হয়েছে ৩১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য, বাংলাদেশ বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ৮০ ও ৯০-এর দশকে যে ধরনের বন্যা হতো এখন তা কমে গেছে। অর্থাৎ নদীকেন্দ্রিক বন্যা কমে গেছে। লোকালয়ে পানি কম ঢোকে। ২০২০ সালের বন্যায় দেশ এক-তৃতীয়াংশ ও ১৯৮৮ সালের বন্যায় দুই-তৃতীয়াংশ পানির নিচে ছিল। তবে নগরবন্যা, নতুন স্থানে তথা ফেনী অঞ্চল, পাহাড়ি ঢল এসব হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই নগরবন্যা বাড়ছে। নদীকেন্দ্রিক বন্যার চেয়ে পাহাড় ও হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা বাড়ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আরও বৃষ্টির মাত্রা বাড়লে ভবিষ্যতে বন্যার মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা। আবার সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন অনেক বেশি বাড়ছে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আকন্দ ১৯৯৪ সাল থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ঝড়, তুফান, ঘূর্ণিঝড় ও আগস্ট পর্যন্ত বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে থাকে। এসব ঝড়, তুফান দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে আসে। সেখানে সর্বোচ্চ অংশ হচ্ছে সুন্দরবনের। সেখানে প্রথম বাধাটা পায়। এর পরে লোকালয়ে আসে। ঝড়ের তাণ্ডব অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে তীব্রতা
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছরে বঙ্গোপসাগরে কতগুলো ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি ও আঘাত হেনেছে তার একটি হিসাব দিয়েছেন। তাতে দেখা গেছে, ৩৪ বছরে বঙ্গোপসাগরে ৯০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে ও উপকূলে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৩টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে।
ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান মহাসাগর ও আরব সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা বাড়ছে। ১৯৪৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৭৫ বছরের তথ্য নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের এক গবেষণা দেখা গেছে, মৌসুমি নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমলেও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। ভারত ও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৮৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৩৪ বছরের তথ্যে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে ২০১৮ সালের পর থেকে যেসব ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে তা ব্যাপক আকার ধারণ করছে। এগুলো তীব্র বা অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, উপকূল অতিক্রম করার পর দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাণ্ডব চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় রেমাল প্রায় ৩৪ ঘণ্টা ছিল। আবার ঘূর্ণিঝড়গুলোর চরিত্র একেক রকম। কোনোটা খুব দ্রুত উপকূল অতিক্রম করে। সিত্রাং এক ঘণ্টায় ৫৭ কিলোমিটার বেগে উপকূল অতিক্রম করে। মিদিলি শেষ ঘণ্টায় ৯৬ কিলোমিটার বেগে উপকূল অতিক্রম করে।
তিনি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত হয় না সেজন্য এখানকার লোকজনের ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতিও তেমন থাকে না।