আবু কাওসার
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৪ এএম
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে ৩০০ কোটি ডলার (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা) ঋণ চেয়েছে সরকার।
এর মধ্যে আইএমএফের কাছে ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০০ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচির বাইরে অতিরিক্ত এই অর্থ চাওয়া হয়েছে। বাড়তি অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করতে চাইছে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ওই দুই সংস্থা। বর্তমানে ওইসব শর্ত চূড়ান্তে দরকষাকষি চলছে। তবে বাড়তি ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী সরকার। যদিও এই ঋণ কবে পাওয়া যাবে, নতুন শর্তগুলো কীÑ সে বিষয়ে এখনও কিছু বলেনি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন থেকে ফিরে চলমান ঋণ কর্মসূচির অবস্থা ও নতুন ঋণের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বসন্তকালীন বৈঠকের ফলাফল ও বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী কিস্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ নতুন করে ঋণ পেতে আগ্রহী। সে জন্য বাড়তি অর্থ চেয়েছে সরকার। এখন দরকষাকষি চূড়ান্ত হলে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারসহ কয়েকটি শর্ত পূরণে পিছিয়ে থাকার কারণে ঋণ কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত পর্যালোচনা মিশন এপ্রিলের পরিবর্তে জুলাইয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইএমএফ। গত ২৪ মার্চ সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বাংলাদেশ সফরে এসে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। ফলে জুনের আগেই দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা চেয়েছে। উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফ ইতোমধ্যে ৫ হাজার কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত জরুরি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি-নির্ভর দেশ হওয়ায় তুলনামূলক সহজ শর্তে এ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার আশা করছে সরকার।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। সেখানে চলমান ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আইএমএফের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। তবে আইএমএফ স্পষ্ট জানিয়েছে, অতিরিক্ত সহায়তা পেতে হলে বাংলাদেশকে কয়েকটি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছেÑ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সমন্বয় (বৃদ্ধি), প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রত্যাহার, টার্নওভার কর আরোপ, করছাড় বাতিল এবং ভ্যাটের অভিন্ন হার চালু করা। পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা সীমিত থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের কাঠামোগত সংস্কারও শর্তের অন্তর্ভুক্ত। চলমান ঋণ কর্মসূচিতেও এ ধরনের শর্ত রয়েছে, যা উভয়পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত। ফলে এসব শর্তে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ কম।
তবে বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন বাড়ায় সরকার অন্যান্য দাতা সংস্থার কাছেও অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছে। আইএমএফের অর্থছাড় না হলে অন্য দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে দরকষাকষির মাধ্যমে শর্ত যতটা সম্ভব শিথিল করে নতুন ঋণ নিতে চায় সরকার। এরই অংশ হিসেবে আইএমএফের শর্ত পূরণে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে ‘রাজস্বনীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, তা নতুন সরকার বাতিল করেছে। তবে শিগগিরই এ বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব বাড়াতে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার বাস্তবায়ন, করছাড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং অটোমেশন কার্যক্রম জোরদারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।